মহান সাধক হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরাণ (র.)সহ ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি ও চায়ের নগরী সিলেট একটি প্রাচীন জনপদ। ১৪ শতকে ইয়েমেনের হযরত শাহজালাল (র.) সিলেট জয় করেন এবং ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তাছাড়া মুঘলদের সাথে যুদ্ধ, নানকার বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে এ জেলার অবদান অপরিসীম।
❖ভৌগোলিক অবস্থান: উত্তরে ভারতের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়, দক্ষিণে মৌলভীবাজার জেলা, পূর্বে ভারতের কাছাড় ও করিমগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা।
✹ ইতিহাস ও নামকরণ
✔ চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দের ভ্রমণ বিবরণী থেকে এ জেলা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
✔ দশম শতাব্দীতে মহারাজা শ্রীচন্দ্র কর্তৃক উৎকীর্ণ পশ্চিমভাগ তাম্রলিপি থেকে তাঁর এ জেলা জয়ের তথ্য জানা যায়।
✔ বিখ্যাত মুসলিম পরিব্রাজক আল-বিরুনি তাঁর ‘কিতাবুল হিন্দ’ নামক গ্রন্থে সিলেটকে সিলাহট নামে উল্লেখ করেন।
✔ প্রাচীনকাল থেকেই এ জেলা শ্রীহট্ট নামে পরিচিত ছিল।
✔ সুলতানী আমলে এ জেলা নাম ছিল জালালাবাদ।
✔ এছাড়া প্রাচীনকাল হতে এ জেলা পাথর (শীল) ও হাটের (ব্যবসা ও বাণিজ্যের) প্রাধান্য ছিল বলে ‘শীল’ ও ‘হাট’ শব্দদ্বয় মিলে সিলেট শব্দের উৎপত্তি হয়।
✹ জেলা গঠন: ১৭৭২ সালের ১৭ মার্চ সিলেট জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত জেলাটি ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই বছর জেলাটি নবসৃষ্ট আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দেশ ভাগের সময় ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে জেলাটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্গত হয় এবং তখন চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন ছিল। ১৯৮৩-৮৪ সালে বৃহত্তর সিলেট জেলাকে ৪টিনতুন জেলায় বিভক্ত করা হয়। ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট সিলেট বিভাগের সৃষ্টি হয়।
❖ বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব: রাজা গিরিশচন্দ্র রায় (প্রতিষ্ঠাতা এমসি কলেজ), জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী (মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি),মেজর জেনারেল এম এ রব (মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড), আবুল মাল আব্দুল মুহিত, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, এম সাইফুর রহমান, হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, বিচারপতি সৈয়দ এবি মাহমুদ হোসেন।
❖নৃ-গোষ্ঠী: মণিপুরি, পাত্র, খাসিয়া, চাকমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল।
❖ নদ-নদী: সুরমা-কুশিয়ারা বেষ্টিত জেলাটির উল্লেখযোগ্য নদ-নদী হলো- সুরমা,কুশিয়ারা,যদুকাটা, পিয়াইন, সারি গোয়াইন, বাগরা, নওয়া, শেওলা, ধামালিয়া,সারি, ধলাই।
❖ চা-বাগান: বাংলাদেশে মোট ১৬৭টি চা-বাগান আছে। তারমধ্যেসিলেট জেলায় মোট চা বাগানের সংখ্যা ২০টি। ১৮৫৪ সালে মতান্তরে ১৮৪৭ সালে সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোডের কাছে মালনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত মালনীছড়াই বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান। স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে শুধুমাত্র দুইটি জেলায় চা আবাদ করা হতো, একটি সিলেট জেলায় যা ‘সুরমা ভ্যালি’ আর অপরটি চট্টগ্রাম জেলায় যা ‘হালদা ভ্যালি’ নামে পরিচিত ছিল।
❖ কৃষিজ দ্রব্যাদি: চা, তেজপাতা, কমলা লেবু, বাঁশ, বেত, পান, সুপারী, মাছ ও চামড়া।
❖ খনিজ সম্পদ: বাংলাদেশে মোট আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র ২৯টি। এ জেলায় অবস্থিত গ্যাসক্ষেত্র হলো- হরিপুর (১৯৫৫, প্রথম গ্যাসক্ষেত্র), কৈলাসটিলা (১৯৬২), বিয়ানীবাজার (১৯৮১), জালালাবাদ (১৯৮৯), ফেঞ্চুগঞ্জ (১৯৮৯), জকিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র (২০২১, ২৮তম)।এছাড়া এখানে রয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারির অঞ্চল ভোলাগঞ্জ। অন্যান্য- পাথর ও চুনাপাথর।
❖ শিল্প নগরী: ২টি (খাদিমনগর ও গোটাটিকর)।
➣ হাকালুকি হাওর: বাংলাদেশের বৃহত্তর হাওর। এটি মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলায় অবস্থিত। এটি ৫টি উপজেলা ও ১১টি ইউনিয়নে বিস্তৃত। জলরাশির মূল প্রবাহ হলো জুরী এবং পানাই নদী। হাওরটিতে প্রায় ২৩৮টি বিল রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিলসমূহ হলো- চাতলা, চৌকিয়া, ডুলা, ফুটি, তুরাল, তেকুনি, পাওল, বালিজুড়ি, কাটুয়া, বিরাই, রাহিয়া, মায়াজুরি, লাম্বা, দিয়া বিল, ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে সিংগুয়া বিল।
➣ সিলেটী নাগরীলিপি: জেলার স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উজ্জ্বলতম দলিল নাগরীলিপি। নাগরীর অক্ষর মাত্র ৩২টি। যুক্ত বর্ণ সাধারণত ব্যবহৃত হয় না। নাগরী লিপিতে ৮৮টি মুদ্রিত গ্রন্থসহ (নাগরী হরফে) ১৪০টি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। নাগরী সাহিত্যের সর্বাধিক জনপ্রিয় কবিছাদেক আলী।
➣ রাতারগুল: জলাবন, রাতারগুল বা সোয়াম্প ফরেস্ট (Ratargul Swamp Forest) বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির জলাবন বা সোয়াম্প ফরেস্ট এবং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। যা সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত। বনের আয়তন ৩,৩২৫ দশমিক ৬১ একর। ১৯৭৩ সালে এই বনের ৫০৪ একর কে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সারা পৃথিবীতে স্বাদুপানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। ভারতীয় উপমহাদেশে রয়েছে দুটি। একটি শ্রীলংকায়, অন্যটি বাংলাদেশের রাতারগুল।
➣ ক্বীন ব্রীজ: সুরমা নদীর ওপর নির্মিত ক্বীন ব্রীজ জেলার প্রবেশদ্বার। আসাম প্রদেশের গভর্ণর মাইকেল ক্বীন সিলেট সফরে আসলে তাঁর স্মৃতিকে স্মরণ করতে এবং আসামের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে ১৯৩৩ সালে ব্রীজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৩৬ সালে ব্রীজটি খুলে দেওয়া হয় এবং নামকরণ করা হয় গভর্ণর মাইকেল ক্বীনের নামে।
❖ দর্শনীয় স্থান: হযরত শাহজালাল (র.) মাজার, হযরত শাহপরাণ (র.) মাজার, মণিপুরি মিউজিয়াম, মিউজিয়াম অব রাজাস, শাহী ঈদগাহ, ওসমানী শিশু পার্ক, জিতু মিয়ার বাড়ি, মহাপ্রভূ শ্রী চৈতন্যদেবের বাড়ী, জাকারিয়া সিটি।
➣ পর্যটন শিল্প: জাফলং, পাংথুমাই গ্রাম, ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা, বিছনাকান্দি, মালনি ছড়া চা বাগান, মালনীছড়া চা বাগান, জলাবন রাতারগুল, আদুরি ঝর্ণা, লাক্কাতুরা চা বাগান,সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা, তামাবিল, সাতছড়ি, জুগিরকান্দি মায়াবন, ডিবির হাওর, কুলুমছড়া ঝর্ণা, জৈন্তাপুর টিলা, সারি টিলা, লালাখাল টিলা ।
➣ স্থল বন্দর/শুল্ক স্টেশন: ৫টি (ভোলাগঞ্জ, তামাবিল, শেওলা, সুতারকান্দি ও জকিগঞ্জ)।
❖ উপজেলা: ১৩টি। যথা- ওসমানীনগর, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ,গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ, জৈন্তাপুর, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ, বিয়ানীবাজার ও সিলেট সদর উপজেলা।
❖ আয়তন: ৩,৪৫২ দশমিক ০৭ বর্গ কি.মি বা ১৩৩২.০০ বর্গমাইল।
❖ জনসংখ্যা: ৩৮,৫৭,০৩৭ জন (জনশুমারি ২০২২)।
❖ শিক্ষার হার: ৭১ দশমিক ৯২ শতাংশ।
❖ থানা: ১৭টি।
❖ সংসদীয় আসন: ৬টি।
❖ সংরক্ষিত আসন: ১টি।
❖ মুক্তিযুদ্ধে: ৫ নং সেক্টর।
❖ বিশ্ববিদ্যালয়: ৭টি (সরকারি ২টি, বেসরকারি ৫টি)।
❖ মেডিকেল কলেজ: ৬টি (সরকারি ১টি, বেসরকারি ৫টি)।
❖ সেনানিবাস: ১টি (জালালাবাদ সেনানিবাস)।