১৮৫৯ সালের ২৪ জুন। ইতালির সলফারিনোতে তৎকালীন ইউরোপের দুই বৃহৎ শক্তি ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে তুমুল যুদ্ধে ফরাসি বাহিনীর জয় লাভ করে। কিন্তু মাত্র ১৫ ঘণ্টার যুদ্ধে আহত হন ৪২ হাজার সৈন্য। সে সময় ব্যবসা-সংক্রান্ত জরুরি কাজে তৃতীয় নেপোলিয়ানের সঙ্গে দেখা করতে ইতালিতে এসেছিলেন সুইস যুবক হেনরি ডুনান্ট। যুদ্ধের এই মর্মান্তিক দৃশ্য তাঁকে খুব পীড়িত করে। তিনি তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগত সব কর্মসূচি বাতিল করে আহতদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
মর্মান্তিক সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ১৮৬২ সালে ডুনান্ট লেখেন ‘মেমোরি অব সলফারিনো’। তাতে তিনি আহতদের সেবায় নিরপেক্ষ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলতে বিশ্ববাসীর প্রতি আবেদন জানান। তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক ‘পাবলিক ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ এগিয়ে আসে। ১৮৬৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ডুনান্ট ও অপর চার মানবসেবীর সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়। যা ‘কমিটি অব ফাইভ’ নামে পরিচিত। ১৮৬৩ সালের ২৬ অক্টোবর এই কমিটি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করে। ১৬ দেশের প্রতিনিধি তাতে যোগ দেন। এবং গঠিত হয় ‘রেড ক্রস’ নামের আন্তর্জাতিক সেবামূলক সংস্থা। তবে মুসলিম বিশ্বে এটি ‘রেড ক্রিসেন্ট’ নামে পরিচিত।
❖ জেনেভা কনভেনশন
১৮৬৪ সালে রেড ক্রসের সূচনাকালে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) উদ্যোগে ও সুইস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জেনেভায় একটি কনভেনশন প্রণীত হয়। সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগালসহ ইউরোপের ১২টি দেশ তাতে স্বাক্ষর করে।
❖প্রতীক
সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনায় একটি প্রতীক নির্ধারণ জরুরি ছিল। কনভেনশনেই সাদা জমিনের ওপর লাল ক্রস চিহ্নযুক্ত প্রতীকটি নির্ধারণ করা হয়। তবে প্রতীকটি একটি বিশেষ ধর্মের বলে সমালোচনার মুখে ১৯২৯ সালের তৃতীয় জেনেভা কনভেনশনে ‘রেড ক্রিসেন্ট’ ও ‘রেড লায়ন অ্যান্ড সান’ নামের আরো দুটি প্রতীক গ্রহণ করা হয়। ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনে অনুযায়ী প্রতীকগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু ১৯৮০ সালে ইরানের ‘রেড লায়ন অ্যান্ড সান সোসাইটি’ তাদের প্রতীকটি পরিবর্তন করে। তবে সংস্থার প্রতীক হিসেবে রেড ক্রস, রেড ক্রিসেন্ট ও রেড ক্রিস্টাল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
❖ সংস্থা পরিচালনা
৩টি অংশীদারিত্ব সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ‘রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট’ আন্দোলন বিশ্বব্যাপী পরিচালিত হয়। এগুলো হলো- ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস (ICRC), ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিস (IFRC) ও জাতীয় সোসাইটিসমূহ (National Societies)। ৩টি অংশীদারিত্ব সমন্বয় সাধনের জন্য ১৯৯৭ সালের ২৫-২৭ নভেম্বর সেভিল চুক্তি গৃহীত হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পাকিস্তান রেড ক্রস সোসাইটির পূর্ব পাকিস্তান ব্রাঞ্চ ‘বাংলাদেশের জাতীয় সোসাইটি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের নিকট স্বীকৃতির আবেদন করে। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের এক আদেশের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি’ গঠিত হয়। ১৯৭৩ সালের ৩১ মার্চ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি আদেশ, ১৯৭৩ (পিও-২৬) জারি করেন। এই আদেশ অনুসারে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ‘বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি’ স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৭৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের তেহরান সম্মেলনে ‘বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি’ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৮৮ সালের ৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে ‘বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি’ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধকালীন ও যুদ্ধোত্তর মানবিক সেবার জন্য আইসিআরসিকে (ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস) ২০১২ সালে Friends of Liberation War Honor প্রদান করে। প্রসঙ্গত, ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই তৎকালীন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সর্তক বার্তা ও জনগণের ক্ষয়-ক্ষতি নিরসনে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি ‘সিপিপি’ চালু করেন।
❂একনজরে
সংস্থার প্রেসিডেন্ট (বর্তমান): Mirjana Spoljaric Egger।
সংস্থার মূলনীতি: ৭টি (মানবতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা, স্বাধীনতা, স্বেচ্ছামূলক সেবা, একতা ও সর্বজনীনতা)।
মূলনীতি গৃহীত: ভিয়েনা কনভেনশনে (১৯১৫)।
প্রতিষ্ঠা: ১৮৬৩ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়।
সদর দপ্তর: সুইজারল্যান্ডের জেনেভা।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের প্রেসিডেন্ট: রাষ্ট্রপতি।
জেনেভা কনভেনশনের সংখ্যা: ৪টি (১৮৬৪, ১৯০৬, ১৯২৯, ১৯৪৯)।
নোবেল লাভ: (ICRC- ১৯১৭, ICRC- ১৯৪৪, ICRC & IFRC- ১৯৬৩)।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য: Henry Dunant, Guillaume Henri Dufour, Gustave Moynier, Louis Appia, Théodore Maunoir।