❖নামকরণ ও ইতিহাস
মেহেররপুর নামকরণ সম্পর্কে এ পযর্ন্ত দুটি অনুমানসিদ্ধ তথ্য পাওয়া যায়। একটি হচ্ছে ইসলাম প্রচারক দরবেশ মেহের আলী নামীয় জনৈক ব্যক্তির নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ষোড়শ শতকের অথবা তার কিছুকাল পরে মেহেরপুর নামের সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বচনকার মিহির ও তাঁর পুত্রবধূ খনা এই শহরে বাস করতেন বলে প্রচলিত আছে। মিহিরের নাম থেকে মিহিরপুর পরবর্তীতে তা অপভ্রংশ হয়ে মেহেরপুর নামের উৎপত্তি হয়েছে।
❖ভৌগোলিক অবস্থান: এটি বাংলাদেশের পশ্চিমাংশের সীমান্তবর্তী জেলা। এ জেলার উত্তরে কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলা ও পশ্চিমবঙ্গ (ভারত)। দক্ষিণে চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলা, দামুড়হুদা উপজেলা ও পশ্চিমবঙ্গ (ভারত)। পূর্বে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলা, চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা। পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। এর পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত প্রায় ৬০ কিলোমিটার ভারতীয় সীমান্ত রয়েছে।
❖ভূ-প্রকৃতি: জেলার সমগ্র ভূ-ভাগ মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ সমভূমি এলাকা। এই এলাকার নদীগুলি দিয়ে বর্ষা ঋতুতেও প্লাবিত হওয়ার মতো পানি থাকে না। তবে নদীগুলির গতিপথ সর্পিল বলে মেহেরপুরে অনেক অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের (Ox bow Lake) সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের উঁচুতম জেলাগুলোর একটি হচ্ছে এ জেলা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর গড় উচ্চতা ২১ মিটার।
❖জেলার ঐতিহ্য: এ জেলার রয়েছে প্রায় দু’হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বিশেষত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনায় মেহেরপুরের ‘মুজিবনগরের’ নাম চিরস্মরণীয়। বাংলাদেশের প্রথম সরকার জেলাটিতে গঠিত এবং শপথ গ্রহণ করায় এ জেলার ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাক্কালে মেহেরপুর জেলার তৎকালীন বৈদ্যনাথতলা (বর্তমানে মুজিবনগর) নামক স্থানে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করে মুজিবনগর সরকার বা বাংলাদেশের প্রথম সরকার। পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ‘মুজিবনগর’ ছিল বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী।
❖ মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স: মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুর প্রাক্কালে মেহেরপুর জেলার তৎকালীন বৈদ্যনাথতালা (বর্তমানে মুজিবনগর) নামক স্থানে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এখানে আছে বঙ্গবন্ধু তোরণ, অডিটোরিয়াম, শেখ হাসিনা মঞ্চ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকেন্দ্র, ২৩টি কংক্রিটের ত্রিকোণ দেয়ালের সমন্বয়ে উদিয়মান সূর্যের প্রতিকৃতিকে প্রতীক করে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া সম্মেলন, বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, পাকবাহিনীর আত্নসমর্পণ, রাজাকার-আলবদরের সহযোগিতায় বাঙালি নারী-পুরুষের ওপর পাক বাহিনীর নির্যাতনসহ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাস্কর্য।
❖ ভবানন্দপুর মন্দির: এটি সদর থানার ভবানন্দপুর গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন মন্দির।
❖ আমদহ গ্রামের স্থাপত্য নিদর্শন: জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন নিদর্শনটি মেহেরপুর শহর থেকে ৪ কি:মি: পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত আমদহ গ্রামের স্থাপত্য কীর্তি। আমদহ গ্রামের এই স্থাপত্য শৈলীর ধ্বংসাবশেষকে রাজা গোয়ালা চৌধুরীর সাথে বগা দস্যুদের যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত আবাসস্থল বলে মনে করা হয়।
❖ বলরাম হাড়ি মন্দির: ১৮ শতকের শেষের দিকে মেহেরপুর শহরের মালোপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন অধ্যাত্মিক সাধক বলরাম হাড়ি। তিনি ‘উপাস’ নামে একটি ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অনুসারীরা বলরামী সম্প্রদায় নামে পরিচিত। ১৮ শতকের শেষের দিকে বা ১৯ শতকের গোড়ার দিকে এ ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ হয়। ১৮৫০ সালে বলরাম হাড়ি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে সমাহিত করা হয়। মেহেরপুরের জমিদার জীবন মুখার্জি এ সাধকের স্মৃতি রক্ষার্থে ৩৫ শতাংশ জমি দান করেন। এ জমির ওপর নির্মাণ করা হয় ‘বলরাম হাড়ির সমাধি মন্দির’।
❖ আমঝুপি নীলকুঠি: নীল চাষ ও নীলকরদের দীর্ঘ ইতিহাস মেহেরপুর বুকে জড়িয়ে রয়েছে। মশিয়ে লুই বান্নো বা বোনার্দ নামক জনৈক ফরাসি ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রথম নীল চাষ শুরু করেন। আমঝুপি নীলকুঠি ১৮১৫ সাল অথবা তার কিছুকাল পরে স্থাপিত হয়।
❖ ভাটপাড়ার নীলকুঠি: সাহারবাটি- ১৮৫৯ সালে স্থাপিত ধ্বংস প্রায় এই নীলকুঠিটি ইট, চুন-শুরকি দ্বারা নির্মাণ করা হয়।
❖ স্বামী নিগমানন্দ আশ্রম: মেহেরপুর জেলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থান হচ্ছে ‘স্বামী নিগমানন্দ আশ্রম’। ১৮ শতকের দিকে মেহেরপুর শহরে রাজা গোয়ালা চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত করেন আটচালা শিবমন্দিরটি। মন্দিরটি বর্তমানে নিগমানন্দ সরস্বতী ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত সরস্বতী আশ্রম হিসেবে কাজ করছে।
❖ সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির: মেহেরপুর শহরের বড় বাজারে অবস্থিত মন্দিরটিকে স্থানীয় হিন্দুরা জেলা কেন্দ্রীয় মন্দির হিসেবে গণ্য করে।
❖ মেহেরপুর শহিদ স্মৃতিসৌধ: ১৯৭১ সালে যে সব বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং যাঁরা পাকিস্থানি সৈনিদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে তাঁদের স্মৃতি রক্ষার্থে মেহেরপুর পৌর কবরস্থানের পাশে স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়েছে।
এম এ হান্নান: মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত।
মো: শাহ আলম: আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। সাফ গেমসের স্বর্ণপদক লাভ করেন। দু’বার দ্রুততম মানব হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। মস্কো অলিম্পিক এ্যাথলেটিক্সে ৫ম, সিউল অলিম্পিকে ৭ম এবং কমনওয়েলথ গেমসে ৯ম স্থান অধিকার করেন।
দীনেন্দ্রকুমার রায়: লেখক।
মোহাম্মদ ছহিউদ্দিন বিশ্বাস: রাজনীতিবিদ। ১৯৭০, ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত মেহেরপুর জেলার গভর্নর মনোনীত হন।
স্বামী নিগমানন্দ: ধর্ম সংস্কারক।
আরজান সাহ: একজন মরমী সাধক। ১৯৮৬ সালে ‘আরজান সাহপদাবলী’ নামে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়।
প্রসেনজিৎ বোস বাবুয়া: নাট্য অভিনেতা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নাটকে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন।
ওয়ালিল হোসেন: বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।
ভবানন্দ মজুমদার: নদীয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। বাদশাহ আকবর প্রদত্ত ফরমানে রাজত্ব লাভ করে নদীয়ায় রাজধানী স্থাপন করেন।
বলরাম হাড়ী: হাড়ী সম্প্রদায়ের প্রবক্তা ও প্রখ্যাত মরমী সাধক।
রফিকুর রশীদ: লেখক।
ইমরুল কায়েস: ক্রিকেটার, বাংলাদেশ ক্রিকেট জাতীয় দল।
লোকসংস্কৃতি: বাউলগীতি, মানিকপীরের গান, ভাসান গান, বিয়ের গান, ক্ষীর খাওয়ানার গান, ঢেঁকি মংলানোর গান, শারি গান, জারি গান, শাস্ত্র গান, ভাটিয়ালী গান, অষ্টগান, কীর্তন, পালা বা যাত্রাগান, ভাবগান বা মারফতি গান, পুথি পাঠ, কবিগান, ব্রত কথা বা ব্রতগীত, গাজন গান জেলার লোকসংস্কৃতির অংশ।
খাদ্যশস্য: প্রধানত ধান, পাট, গম, আলু, কচু, মসুর, ভুট্টা, সরিষা, পান, কলা, আনারস, কাঁঠাল ও শীতকালীন শাকসবজি উৎপন্ন হয়।
প্রধান নদীঃ ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, ছেউটি, কাজলা, স্টুয়ার্ট খাল এবং মড়কা খাল।
❖উপজেলা ও ইউনিয়ন
|
উপজেলা
|
ইউনিয়ন
|
|
মেহেরপুর সদর
|
কুতুবপুর, বুড়িপোতা, আমঝুপি, আমদহ, পিরোজপুর।
|
|
মুজিবনগর
|
দারিয়াপুর, মোনখালী, বাগোয়ান, মহাজনপুর।
|
|
গাংনী
|
কাথুলী, তেতুঁলবাড়ীয়া, কাজিপুর, বামন্দি, মটমূড়া, ষোলটাকা, সাহারবাটি, ধানখোলা, রাইপুর।
|
❖একদৃষ্টিতে
আয়তন: ৭১৬.০৮ বর্গ কিলোমিটার।
জনসংখ্যা: ৭০৫,৩৫৬ জন (প্রাথমিক প্রতিবেদন, জনশুমারি ২০২২)।
শিক্ষার হার: ৬৮.০৪ শতাংশ (প্রাথমিক প্রতিবেদন, জনশুমারি ২০২২)।
উপজেলা: ৩টি (মেহেরপুর সদর, মুজিবনগর ও গাংনী)।
ইউনিয়ন: ১৮টি।
সংসদীয় আসন: ২টি।
মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর: ৮নং।