❂❂❂ ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষকে ভাগ করার দায়িত্ব পেয়েছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র্যাডক্লিফ। তাঁর আঁকা সীমানা ধরে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান। র্যাডক্লিফের কাঁচিতে কাটা পড়ে পূর্ববঙ্গ প্রদেশ ঢুকে যায় নতুন বানানো পাকিস্তান রাষ্ট্রের পেটে। নানা চড়াই–উতরাই পার হয়ে পূর্ববঙ্গ হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধে বীর সেনানীদের আত্মত্যাগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আসে মহা বিজয়। এ-যুদ্ধে অসম সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য মুজিবনগর সরকার অনুমোদন করেন বীরত্বসূচক খেতাব।
❖❖❖ মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের বীরত্ব ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং তাঁদের প্রেরণা সৃষ্টির লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী ১৯৭১ সালের মে মাসে প্রথমদিকে মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদে বীরত্বসূচক খেতাব প্রদানের একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। ১৬ মে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে খেতাব প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। এ-পরিকল্পে ৪ পর্যায়ের খেতাব প্রদানের বিধান ছিল: সর্বোচ্চ পদ, উচ্চ পদ, প্রশংসনীয় পদ ও বীরত্বসূচক প্রশংসাপত্র। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সভায় বীরত্বসূচক খেতাবের নতুন নামকরণ করা হয়: বীরশ্রেষ্ঠ (সর্বোচ্চ), বীর-উত্তম (উচ্চ), বীরবিক্রম (প্রশংসনীয়) ও বীরপ্রতীক (বীরত্বসূচক)। ১৯৭২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৪৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বীরত্বসূচক খেতাবের জন্য নির্বাচন করা হয়। ১৯৭৩ সালের ২৬ মার্চ পূর্বের ৪৩ জনসহ মোট ৫৪৬ জন মুক্তিযোদ্ধা খেতাবের জন্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ইউনিট, সেক্টর, ব্রিগেড থেকে পাওয়া খেতাবের জন্য সুপারিশসমূহ এয়ার ভাইস মার্শাল এ. কে খন্দকারের নেতৃত্বে একটি কমিটি দ্বারা নিরীক্ষা করা হয়।
১৯৭৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খেতাব তালিকায় স্বাক্ষর করেন। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্বে নির্বাচিত সব মুক্তিযোদ্ধার নামসহ মোট ৬৭৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে খেতাব প্রদান করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। ১৯৯২ সালের ১৫ ডিসেম্বর জাতীয়ভাবে বীরত্বসূচক খেতাব প্রাপ্তদের পদক ও রিবন প্রদান করা হয়। ২০০১ সালের ৭ মার্চ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিক পুরস্কার এবং সনদপত্র প্রদান করা হয়।
❖ খেতাবের ক্যাটাগরি
বীরশ্রেষ্ঠ: ৭ জন।
বীর-উত্তম: ৬৮ জন।
বীরবিক্রম: ১৭৫ জন।
বীরপ্রতীক: ৪২৬ জন।
❖খেতাব প্রদান: ২০১০ সালে কর্নেল জামিলকে মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদবি দেওয়া হয় এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঁচানোর চেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
❖খেতাব বাতিল: এ-পর্যন্ত খেতাব বাতিল হয়েছে ৮ জনের। ২০২১ সালের ৬ জুন জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ খুনির মুক্তিযুদ্ধের খেতাব বাতিল করে সরকার। তারা হলেন–
∎ লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম (বীর উত্তম, গেজেট নং ২৫)।
∎ লে. কর্নেল এস এইচ এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী (বীর বিক্রম, গেজেট নং ৯০)।
∎ লে. এ এম রাশেদ চৌধুরী (বীর প্রতীক, গেজেট নং ২৬৭)।
∎ নায়েক সুবেদার মোসলেম উদ্দিন খান (বীর প্রতীক, গেজেট নং ৩২৯)।
❖ এ-ছাড়া অন্য কারণে খেতাব বাতিল হয়েছে–
∎ ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন (বীর উত্তম, গেজেট নং ৭২)।
∎ মোজাহিদ সিরাজুল হক (বীর বিক্রম, গেজেট নং ১৬২)।
∎ কনস্টেবল তৌহিদ (বীর বিক্রম, গেজেট নং ২১২)।
∎ সুবেদার মেজর আবদুল হাই (বীর প্রতীক, গেজেট নং ৩৩৪)।
• জন্ম: ১৯৪৯ সালের ৭ মার্চ।
• মৃত্যু: ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর।
• জন্মস্থান: রহিমগঞ্জ গ্রাম, বাবুগঞ্জ উপজেলা, বরিশাল জেলা।
• পিতা: আব্দুল মোতালেব হাওলাদার।
• মাতা: সাফিয়া বেগম।
• কর্মস্থল: সেনাবাহিনী।
• পদবি: ক্যাপ্টেন।
• যুদ্ধরত সেক্টর: ৭ নং।
• খেতাব নম্বর: ১।
• সমাধিস্থল: চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ চত্বর।
➢ শিক্ষা: ১৯৫৩ সালে পাতারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু। ১৯৬৪ সালে মুলাদি মাহমুদ জান পাইলট হাইস্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৬৬ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।
➢ কর্মজীবন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৬৭ সালের ৩ অক্টোবর ১৫তম শর্ট সার্ভিস কোর্সে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালের ২ জুন ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কমিশন লাভ করেন। সেনাবাহিনীতে তাঁর নম্বর ছিল PSS-১০৪৩৯। মিলিটারি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং, রিসালপুর থেকে অফিসার বেসিক কোর্স-২৯ এবং ইনফেন্ট্রি স্কুল অব ট্যাকটিস থেকে অফিসার উইপন কোর্স সম্পন্ন করেন তিনি।
➢ যুদ্ধে যোগদান: ১৯৬৯ সালে আগস্ট মাসের শেষে এক মাসের ছুটিতে দেশে আসেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালাচ্ছিলো তখন তিনি কারাকোরামে কর্মরত ছিলেন। গণহত্যার সংবাদ পেয়ে ৩ জুলাই বাঙালি অফিসার ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন, ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার ও ক্যাপ্টেন আনামের সঙ্গে শিয়ালকোটের নিকটবর্তী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। তাঁর পোস্টিং হয় ৭ নং সেক্টরের মহোদিপুর সাব-সেক্টরে। তিনি অসামান্য বীরত্বের সঙ্গে আরগরারহাট, কানসাট, শাহপুর এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং মুক্তাঞ্চল গঠন করেন।
➢ মৃত্যুবরণ: ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী তাঁর নেতৃত্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আক্রমণ করে। যুদ্ধে অপরিসীম বীরত্ব প্রদর্শন করেন। ১৪ ডিসেম্বর সকালে পাকিস্তানী বাহিনীর স্নাইপার বুলেটের আঘাতে তিনি শহিদ হন।
➢ সমাধি: ১৫ ডিসেম্বর তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নে সোনা মসজিদ চত্বরে তাঁকে সমাহিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করেন।
এ-ছাড়া মসজিদের দেয়ালের বাইরে নির্মাণ করা হয়েছে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতিসৌধ। বরিশালের বাবুগঞ্জে তাঁর সম্মানে ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ইউনিয়ন’। তাঁর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার।
• জন্ম: ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩।
• মৃত্যু: ২৮ অক্টোবর ১৯৭১।
• জন্মস্থান: খোর্দ্দ খালিশপুর গ্রাম, কালিগঞ্জ উপজেলা, ঝিনাইদহ জেলা।
• পিতা: আক্কাস আলী মন্ডল।
• মাতা: কায়েদুননেসা।
• কর্মস্থল: সেনাবাহিনী।
• পদবি: সিপাহী।
• যুদ্ধরত সেক্টর: ৪ নং।
• খেতাব নম্বর: ২।
• সমাধিস্থল: মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থান (বর্তমান)।
➢ শিক্ষা: পঞ্চম শ্রেণী পাশ করে স্থানীয় নৈশ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। দারিদ্র্তার কারণে আর পড়াশোনা হয়নি।
➢ কর্মজীবন: ১৯৭০ সালে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি যোগ দেন পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে। প্রশিক্ষণের জন্য গমন করেন চট্টগ্রাম ইবিআরসিতে। ২৫ মার্চ কালরাতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২০ বেলুচ রেজিমেন্টের সেনারা হামলা চালায় সেখানে। হামিদুর রহমান ফিরে যান নিজ গ্রামে।
➢ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ: মায়ের কাছে অনুমতি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে যোগ দেন যশোরের কাছে অবস্থানরত ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে। ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের ধলই সীমান্ত ঘাঁটি দখলের যুদ্ধে শহিদ হন তিনি। আম্বাসার হাতিমারাছড়া গ্রামে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর সরকারের উদ্যোগে তাঁর দেহাবশেষ স্থানান্তর করে রাষ্ট্রীয় সম্মানে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে পুনঃসমাহিত করা হয়। উল্লেখ্য, তিনি বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁর নিজ গ্রাম খোর্দ্দ খালিশপুরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘হামিদ নগর’।
• জন্ম: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৪৭।
• মৃত্যু: ১৮ এপ্রিল ১৯৭১।
• পিতা: হাবিবুর রহমান
• মাতা: মোসাম্মত সালেকা বেগম।
• জন্মস্থান: পশ্চিম হাজিপুর গ্রাম, দৌলতখান থানা, ভোলা জেলা।
• কর্মস্থল: সেনাবাহিনী।
• পদবি: সিপাহী।
• যুদ্ধরত সেক্টর: ৮ নং।
• খেতাব নম্বর: ৩।
• সমাধিস্থল: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার দরুইন গ্রাম।
➢ কর্মজীবন ও মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে নিয়োগ পান কুমিল্লায় ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ১৯৭১ সালের উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে অভ্যন্তরীণ গোলোযোগ নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মোতায়েন করে। পাকিস্তানি চক্রান্ত বুঝতে পেরে কয়েকজন বাঙ্গালি সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে মেজর শাফায়াত জামিল অধিনায়ক লে. কর্নেল খিজির হায়াত খানসহ সকল পাকিস্তানি অফিসার ও সেনাদের গ্রেফতার করেন।
এরপর মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে আশুগঞ্জ, উজানিস্বর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এন্ডারসন খালের পাশ দিয়ে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেন। ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনীর ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। গঙ্গাসাগর প্রতিরক্ষা অবস্থানের দরুইন গ্রামে নিয়োজিত আলফা কোম্পানির ২ নং প্লাটুনের একজন সেকশন কমান্ডার ছিলেন মোহাম্মদ মোস্তফা। পাকিস্তানি আক্রমণে প্লাটুনটির সমস্ত রেশন ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে আসা হানাদার বাহিনীকে ঠেকাতে আখাউড়ার দরুইন গ্রামে অবস্থান নেয়। ১৭ এপ্রিল পাক বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। ১৮ এপ্রিল যুদ্ধে তিনি আহত হলে পাক বাহিনী বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করে। দরুইল গ্রামেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। স্বাধীনতার পর তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
• জন্ম: ২৪ মার্চ ১৯৩৫।
• মৃত্যু: ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১।
• জন্মস্থান: বাঘচাপড়া গ্রাম, বেগমগঞ্জ উপজেলা, নোয়াখালী জেলা।
• পিতা: মোহাম্মদ আজহার পাটোয়ারি।
• মাতা: জোলেখা খাতুন।
• কর্মস্থল: নৌ বাহিনী।
• পদবি: জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (স্কোয়াড্রন ইঞ্জিনিয়ার)।
• যুদ্ধরত সেক্টর: ১০ নং।
• খেতাব নম্বর: ৪।
• সমাধিস্থল: রূপসা ফেরিঘাটের লুকপুরে।
➢ শিক্ষা: পড়াশোনা শুরু হয় পাড়ার মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে। পরে বাঘচাপড়া প্রাইমারি স্কুলে। স্কুল পাশ করে ভর্তি হন আমিষা পাড়া হাইস্কুলে।
➢ কর্মজীবন ও মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৫৩ সালে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন নৌ বাহিনীতে এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণের জন্য গমন করেন করাচীর অদূরে মানোরা দ্বীপে পিএনএস. কারসাজ-এ (নৌ বাহিনীর কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)। ১৯৫৮ সালে পেশাগত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন এবং ১৯৬৫ সালে মেকানিশিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। সফলভাবে কোর্স শেষে ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে তিনি পিএনএস বখতিয়ার নৌ-ঘাটি চট্টগ্রামে বদলি হন। ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে ২নং সেক্টরে যোগ দেন। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বহু সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন।
সেপ্টেম্বর ১৯৭১ এ বাংলাদেশ নৌ বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে সকল সেক্টর থেকে প্রাক্তন নৌ সেনাদের আগরতলায় সংগঠিত করে নৌ বাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো গঠন করা হয়। পরে তাদের কোলকাতায় আনা হয়। সেখানে সবার সাথে তিনিও ছিলেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ নৌ বাহিনীকে দুইটি টাগবোট উপহার দেয়। এগুলোকে কোলকাতার গার্ডেনরীচ নৌ ওয়ার্কসপে দুইটি বাফার গান ও মাইন পড লাগিয়ে গানবোটে রূপান্তরিত করা হয়। গানবোট দুটির নামকরণ করা হয় ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’। তিনি ‘পলাশের’ ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার হিসেবে নিয়োগ পান। ৬ ডিসেম্বর মংলা বন্দরে পাকিস্তানী নৌ ঘাটি পিএনএস তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে গানবোট পদ্মা, পলাশ ও মিত্র বাহিনীর ‘পানভেল’ ভারতের হলদিয়া নৌ ঘাটি থেকে রওনা হয়। ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টে প্রবেশ করে। ১০ ডিসেম্বর মংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি পৌঁছালে বিমান হামলা ‘পলাশ’ ধ্বংস হয়ে যায়। রুহুল আমিন নদীতে ঝাঁপ দেন এবং আহত অবস্থায় পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। দুর্ভাগ্যবশত পাড়ে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে তাঁর মৃত দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
• জন্ম: ২৯ অক্টোবর ১৯৪১।
• মৃত্যু: ২০ আগস্ট ১৯৭১।
• জন্মস্থান: ঢাকা।
• পিতা: মৌলভী আব্দুস সামাদ।
• মাতা: সৈয়দা মোবারকুন্নেসা।
• কর্মস্থল: বিমান বাহিনী।
• পদবি: ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট।
• খেতাব নম্বর: ৫।
• সমাধিস্থল: মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান (বর্তমান)।
➢ শিক্ষা: ১৯৫২ সালে মতিউরকে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ভর্তি হন পাকিস্তান বিমান বাহিনী স্কুল, সারগোদায়। ১৯৬০ সালে ডিস্টিংকশনসহ মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।
➢ কর্মজীবন: ১৯৬১ সালের ১৫ আগস্ট ৩৬তম জিডি (পি) কোর্সে ফ্লাইট ক্যাডেট হিসাবে যোগ দেন পাকিস্তান বিমান বাহিনী একাডেমি, রিসালপুরে। ১৯৬৩ সালের ২৩ জুন ফ্লাইট ব্রাঞ্চে কমিশন লাভ করেন। বিমান বাহিনীতে ২ নং ট্রেনিং স্কোয়াড্রন-মৌরিপুর, ফাইটার লিডারশীপ স্কুল-করাচী এবং ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর স্কুলে সফল ভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। চাকুরী জীবনে তিনি এফ-৮৬ জঙ্গী বিমানের পাইলট হিসাবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন ১৯ নং ফাইটার স্কোয়াড্রন ও ২৫ নং স্কোয়াড্রনে। প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিমান বাহিনী একাডেমি রিসালপুরে ও ২ নং স্কোয়াড্রনে। ১৯৬৭ সালে এক পাঞ্জাবী পাইলটের সাথে প্রশিক্ষণ কামান আকাশ যুদ্ধে লিপ্ত হলে দূর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে তাদের উভয়কেই কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি করা হয়। বিচারে পাঞ্জাবী পাইলটের শাস্তি না হলেও তিনি এক বছরের জন্য গ্রাউন্ডেড হন। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের শেষে ছুটিতে ঢাকায় আসেন। ৯ মে ফিরে যান কর্মস্থলে এবং কর্তৃপক্ষের কাছে দেরিতে যোগদানের কারণ দর্শানোর পর তাঁকে ফ্লাইং সেফটি অফিসারের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
➢ মুক্তিযুদ্ধ: কর্মস্থলে যোগ দিয়ে একটি বিমান ছিনতাই করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের পরিকল্পনা করতে থাকেন। ২০ আগস্ট ১৯৭১ পাঞ্জাবি পাইলট অফিসার রাশেদ মিনহাজসহ টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান (কল সাইন ব্লু-বার্ড-১৬৬) ছিনতাই করে ভারত অভিমুখে উড্ডয়ন করেন। অপর পাইলটের সঙ্গে কন্ট্রোল নিয়ে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সিন্ধুর বেদিনে বিমানটি বিধ্বস্ত হলে উভয় মৃত্যুবরণ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাঁর মৃত দেহ উদ্ধার করে মশরুর বিমান ঘাটির ৪র্থ শ্রেণীর কবরস্থানে অত্যন্ত অমর্যাদার সঙ্গে দাফন করেন। ২০০৬ সালের ২৪ জুন মতিউরের দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে দেশে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনঃসমাহিত করা হয়। স্বাধীনতার পর তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
• জন্ম: ৮ মে ১৯৪৩।
• মৃত্যু: ৮ এপ্রিল ১৯৭১।
• জন্মস্থান: সালামতপুর গ্রাম, বোয়ালমারী থানা, ফরিদপুর জেলা।
• পিতা: মুন্সি মেহেদি হাসান।
• মাতা: মকিদুন্নেসা।
• কর্মস্থল: ই পি আর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস)।
• পদবি: ল্যান্স নায়েক।
• খেতাব নম্বর: ৬।
• মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর: ১ নং।
• সমাধিস্থল: রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পাশে ।
➢ কর্মজীবন ও মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৬৩ সালের ৮ মে যোগ দেন ইপিআরে। প্রশিক্ষণ শেষে নিয়োগ পান পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব। ১৯৭১ সালের মার্চে কর্মরত ছিলেন ইপিআরের ১১ নং উইং চট্টগ্রামে। ২৫ মার্চ কালরাতে যোগ দেন ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআরের ১৫০ জন সৈনিকের দায়িত্বে দেওয়া হয় রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি নৌ পথে নিরাপত্তাবুহ্য তৈরির। এই দলের এক নম্বর এলএমজি চালক হিসেবে তিনি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নানিয়ারচর উপজেলাধীন বাকছড়ির একটি বাঙ্কারে। ৮ এপ্রিল রাঙ্গামাটি মহালছড়ি নৌপথে পাকিস্থানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং হানাদার বাহিনীর মর্টারের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃতদেহ নানিয়ারচরের চিংড়ি খাল সংলগ্ন একটি টিলার ওপর সমাহিত করা হয়। ১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল এই বীরের সমাধির হদিস মিলে। দয়াল চন্দ্র চাকমা নামে এক স্থানীয় পাহাড়ি যিনি তাঁকে সমাধিস্থ করেছিলেন তাঁর সহায়তায় শনাক্ত করা হয় তাঁর সমাধি। স্বাধীনতার পর তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
• জন্ম: ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬
• মৃত্যু: ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
• জন্মস্থান: যশোর জেলার অর্ন্তগত নড়াইল মহকুমার মহিষখোলা গ্রাম।
• পিতা: আমানত শেখ।
• মাতা: জেন্নাতুন নেসা।
• কর্মস্থল: ই পি আর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস)।
• পদবি: ল্যান্স নায়েক।
• খেতাব নম্বর: ৭।
• মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর: ৮ নং।
• সমাধিস্থল: যশোরের কাশিপুর নামক স্থানে।
➢ কর্মজীবন ও মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন ইপিআরে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে দিনাজপুর সেক্টরে যুদ্ধরত অবস্থায় আহত হন। যুদ্ধ শেষে ‘তকমা-ই-জং’ ও ‘সিতারা-ই-হারব’ মেডেল লাভ করেন। ১৯৭১সালের মার্চ ছুটিতে ছিলেন গ্রামের বাড়িতে। মুক্তিযুদ্ধে চুয়াডাঙ্গায় ইপিআরের ৪নং উইং এ নিজ কোম্পানির সঙ্গে যোগ দেন। নিয়োগ পান ৮নং সেক্টরের বয়রা সাব-সেক্টরে। ৫ সেপ্টেম্বর সুতিপুর প্রতিরক্ষা অবস্থানের সামনে স্ট্যান্ডিং পেট্রোলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালনের সময় মুত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃতদেহ সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র কাশিপুরে সমাহিত করা হয়।
