পানাম নগরের ইতিহাস
১৫ শতকে ঈসা খাঁ বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন সোনাগাঁওয়ে। পূর্বে মেঘনা আর পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা নদীপথে বিলেত থেকে আসতো বিলাতি থানকাপড়, দেশ থেকে যেতো মসলিন। শীতলক্ষ্যা ও মেঘনার ঘাটে প্রতিদিনই ভিড়তো পালতোলা নৌকা। প্রায় ঐসময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ইউরোপীয় অনুপ্রেরণায় নতুন ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে গড়ে ওঠে পানাম নগরী। পরবর্তীতে এই পোশাক বাণিজ্যের স্থান দখল করে নেয় নীল বাণিজ্য। ইংরেজরা এখানে প্রতিষ্ঠা করেন নীলের বাণিজ্যকেন্দ্র।
ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টারের মতে, সুলতানী আমলে পানাম ছিল সোনারগাঁর রাজধানী। কিন্তু পানামে সুলতানী আমলের তেমন কোনো স্থাপত্য নজরে পড়ে না। জেম্স টেলরের মতে, সোনারগাঁওয়ের প্রাচীন শহর ছিল পানাম। শহরটিতে ঔপনিবেশিক ধাঁচের দোতলা এবং একতলা বাড়ি রয়েছে প্রচুর। যার বেশিরভাগ বাড়িই ঊনবিংশ শতাব্দীর (১৮১৩ সালের নামফলক রয়েছে)। মূলত পানাম ছিল হিন্দু ধনী ব্যবসায়ীদের বসতক্ষেত্র।
১৬১১ সালে মোঘলদের সোনারগাঁও অধিকারের পর সড়ক ও সেতু নির্মাণের ফলে রাজধানী শহরের সাথে পানাম এলাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পানামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পঙ্খীরাজ খাল। শের শাহের আমলে নির্মিত সোনারগাঁ থেকে সিন্ধু পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মাইলের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড-ট্রাংক রোডের কিছু অস্তিত্ব আজও পানামে দেখা যায়।
নির্দশন
পানামের টিকে থাকা বাড়িগুলোর মধ্যে ৫২টি বাড়ি উল্লেখযোগ্য। পানাম সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি এবং দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি রয়েছে। বাড়িগুলোর অধিকাংশই আয়তাকার, উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত, উচ্চতা একতলা থেকে তিনতলা। বাড়িগুলোর স্থাপত্যে ঔপনিবেশিকতা ছাড়াও মোঘল, গ্রিক এবং গান্ধারা স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে স্থানীয় কারিগরদের শিল্পকুশলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। নগরীর পানি সরবাহের জন্য দুপাশে ২টি খাল ও ৫টি পুকুর রয়েছে। নগরীর ভিতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও রয়েছে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মঠ, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, গুপ্ত পথ, বিচারালয়, পুরনো জাদুঘর। এছাড়া রয়েছে ৪০০ বছরের পুরনো টাঁকশাল বাড়ি। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে নির্মিত গোয়ালদী হোসেন শাহী মসজিদ। এছাড়াও রয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীলকুঠি। পানাম পুলের কাছে দুলালপুর সড়কের পাশেই এর অবস্থান। পঙ্খীরাজ খালের ওপর ১৭ শতকে নির্মিত পানাম-দুলালপুর পুল।
অবক্ষয়
ব্রিটিশরা বাংলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সম্ভ্রান্ত মুসলিম ব্যবসায়ীদেরকে অসহযোগিতার কারণে তাঁরা এলাকাটি ছেড়ে যায়। সেখানে উচ্চ বর্ণের হিন্দু ব্যবসায়ীদের অবস্থান তৈরি হয়। বর্তমানে পানাম নগরে রাস্তার দুইধারে পুরনো যেসব ভবন দেখা যায়, তা মূলত ব্রিটিশদের সহায়তায় গড়ে ওঠা উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর হিন্দু উচ্চ বর্ণের ব্যবসায়ীদের তৈরি। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর এসব ব্যবসায়ীদের প্রতিপত্তিও হ্রাস পায়। ফলে ভবনগুলো ক্রমে পরিত্যক্ত হয়।