পটুয়াখালী জেলার পরিচিতি
পটুয়াখালী জেলাকে বলা হয় সাগরকন্যা। দেশের সর্বদক্ষিণে ‘কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত’ এই জেলার ঐতিহ্য। সমুদ্র সৈকতটিতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের বিরল দৃশ্য অবলোকন করতে পারেন পর্যটকরা।
সীমানা: জেলার উত্তরে বরিশাল জেলা, দক্ষিণে বরগুনা জেলা ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভোলা জেলা ও তেঁতুলিয়া নদী এবং পশ্চিমে বরগুনা জেলা।
নামকরণ: জেলার নামকরণের ক্ষেত্রে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে, দেবেন্দ্র নাথ দত্তের পুরনো কবিতার সূত্র ধরে ‘পতুয়ার খাল’ থেকে পটুয়াখালী নামের উৎপত্তি। ‘বরিশালের ইতিহাস’-এর লেখক সিরাজ উদ্দিন আহমেদের মতে, সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগীজ জলদস্যুদরা এ অঞ্চলে হামলা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, নারী নির্যাতন, অপহরণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাতো। এ-সময় বর্তমান পটুয়াখালী শহর এলাকা ছিল সুন্দরবন ও নদীর উত্তর পাড়ে ছিল লোকালয়। উত্তর পাশের বর্তমান লাউকাঠী নদী ছিল লোহালিয়া ও পায়রা নদীর ভাড়ানী খাল।
এই ভাড়ানী খাল দিয়ে পর্তুগীজদের আগমনের কারণে স্থানীয়দের নিকট এটি ‘পতুয়ার খাল’ নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে এই ‘পতুয়ার খাল’ থেকে পটুয়াখালীর উৎপত্তি হয়। নামকরণের অপর দু’টি মত হলো, এ অঞ্চলে একসময় পটুয়ার দল বাস করত। তাঁরা নিপুণ হাতে মৃত্পাত্র তৈরি করে তাতে নানা ধরনের পট বা ছবির সন্নিবেশ ঘটাতো। এই ‘পটুয়া’ থেকে ‘পটুয়াখালী’ নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। অথবা পেট-আকৃতির খাল বেষ্টিত এলাকা হয়তো পেটুয়াখালী এবং পরে তা অভিহিত হয় পটুয়াখালী নামে।
জেলা গঠন: পটুয়াখালী প্রাচীন রাজত্ব চন্দ্রদ্বীপের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বাউফল উপজেলার কচুয়া ছিল রাজত্বটির রাজধানী। প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং ঘন ঘন পর্তুগীজ ও মগদের আক্রমনের কারণে রাজধানীটি পরবর্তীতে বরিশালের মাধবপাশায় স্থানান্তর করা হয়। সম্রাট আকবরের মন্ত্রী রাজা টোডরমল ১৫৯৯ সালে কানুনগা জিম্মক খানকে এলাকাটি জরিপ করতে পাঠান। তখন চন্দ্রদ্বীপের বন এলাকা চন্দ্রদ্বীপ থেকে পৃথক করে বাজুহাদবা সুরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে সেলিমাবাদ, বাজুগ উমেদপুর এবং উরানপুরে তিনটি পরগনাসহ এই অঞ্চল গঠন করা হয়। ১৮০৭ সালে মি: বেটি বরিশালের জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হন। দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন কেটে বসত বৃদ্ধি পাওয়ায় বেটির শাসন আমলে ১৮১২ সালে পটুয়াখালীকে নিয়ে গঠন করা হয় মির্জাগঞ্জ থানা।
পরবর্তীতে দেওয়ানী শাসন প্রসারের জন্য ১৮১৭ সালে বরিশালে ৪টি পৃথক মুন্সেফী চৌকি স্থাপন করা হয় । এগুলো হলো- বাউফল, কাউখালী, মেহেন্দিগঞ্জ ও কোটের হাট চৌকি। বাউফল চৌকির প্রথম মুন্সেফ ছিলেন ব্রজ মোহন দত্ত। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালের পহেলা জুন বাউফল থেকে চৌকি স্থানান্তর করা হয় লাউকাঠীতে। এসময় ব্রজ মোহন দত্ত পটুয়াখালীকে নতুন মহকুমা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। ব্রজ মোহন দত্তের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ১৮৬৭ সালের ২৭ মার্চ কলকাতা গেজেটে পটুয়াখালী মহকুমা সৃষ্টির ঘোষণা প্রকাশিত হয় এবং ১৮৭১ সালে মহকুমায় রূপান্তরিত হয়। ১৯৬৯ সালে পটুয়াখালী জেলা সৃষ্টি হয়। একই বছরের ৯ মার্চ জেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস এডমিরাল এস. এম আহসান। জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন হাবিবুল ইসলাম।
➣ কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সমুদ্র সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র। এটি ‘সাগর কন্যা’ হিসেবে পরিচিত। এর দৈর্ঘ্য ১৮ কিলোমিটার। জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নে এটি অবস্থিত। এটি দেশের একমাত্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায়। সূর্যোদয় দেখা যায় সৈকতের গঙ্গামতির বাঁক থেকে এবং সূর্যাস্ত পশ্চিম সৈকত থেকে।
এছাড়া সমুদ্র সৈকতের পাশে দেড় শতাধিক একর জমিতে অবস্থিত নারিকেল বাগান। যেটি ‘নারিকেল কুঞ্জ’ নামে পরিচিত। ১৯৬০ সালে ফয়েজ মিয়া নামক ব্যক্তি ‘ফার্মস এন্ড ফার্মস’ নামে এ বাগান গড়ে তোলেন। সৈকতের পূর্ব দিকে রয়েছে মনোরম ঝাউ বাগান। সৈকত থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে আন্ধারমানিক নদীর মোহনার পূর্ব দিকে অবস্থিত লেম্বুর চর।
➣পায়রা সমুদ্র বন্দর: জেলার কলাপাড়া উপজেলার রাবনাবাদ চ্যানেলসংলগ্ন আন্ধারমানিক নদীর পাড়ের টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়ায় অবস্থিত। এটি দেশের তৃতীয় ও গভীরতম সমুদ্রবন্দর। ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর বন্দরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এবং ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর হতে নিয়মিত কয়লাবাহী জাহাজ আসা শুরু করে।
➣ রাবনাবাদ চ্যানেল: জেলার কলাপাড়া উপজেলার অবস্থিত। পায়রা সমুদ্রবন্দরের পাশ দিয়ে বহমান চ্যানেলটি ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। দেশের গভীরতম চ্যানেলটির গভীরতা ১০.৫ মিটার। ২০২২ সালের ১ আগস্ট চ্যানেলের খননকাজ শুরু হয়। বেলজিয়াম ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ড্রেজিং কোম্পানি ‘জান ডে নুল’ এটির খননকাজ সম্পন্ন করে। ড্রেজিং কোম্পানি ‘জান ডে নুল’ ১৯৫১ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে ড্রেজিংয়ের কাজ করে আসছে। ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের সংযোগকারী পৃথিবীর বৃহত্তম কৃত্রিম চ্যানেল ‘সুয়েজ খাল’ খননের একক কৃতিত্ব রয়েছে এই কোম্পানির।
➣ পায়রা তাপ বিদ্যুৎ: কেন্দ্র জেলার কলাপাড়া উপজেলা অবস্থিত। ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন আল্ট্রা-সুপারক্রিটিকাল প্রযুক্তিসহ কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হয় ২০২২ সালে।
➣ পানি জাদুঘর: এটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর। জেলার কলাপাড়া উপজেলায় কুয়াকাটা-ঢাকা মহাসড়কের পাশে ‘পাখিমারা’ নামক স্থানে অবস্থিত। নদী ও পানিসম্পদ রক্ষায় জনসচেতনাতা বৃদ্ধের উদ্দেশ্য ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এনজিও ‘একশন এইড’ এটি প্রতিষ্ঠা করে। জাদুঘরটিতে সংরক্ষিত রয়েছে যমুনা, বুড়িগঙ্গা, পদ্মা, আন্ধারমানিক, মেঘনাসহ ৯০টির অধিক নদীর পানির নমুনা।
➣ আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য বন্দর: জেলার কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত দেশের বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। ২০২১ সালে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র দুইটি উদ্বোধন করা হয়।
➣ ক্র্যাব আইল্যান্ড: জেলার কলাপারা উপজেলায় অবস্থিত। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পূর্ব দিকে গঙ্গা-মতির জঙ্গল ছাড়িয়ে সামনে গেলে রয়েছে ক্র্যাব আইল্যান্ড বা কাঁকড়ার দ্বীপ।
➣ জাহাজমারা সমুদ্র সৈকত: রাঙাবালী উপজেলার বড় বাইশদিয়া ইউনিয়নের সমুদ্রপাড়ে অবস্থিত।
➣ ফাতরার বন: জেলার কলাপারা উপজেলায় অবস্থিত। আন্ধারমানিক নদীর মোহনার পশ্চিম দিকে রয়েছে সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল; যেটি নাম ফাতরার বন। যা বইয়ের ভাষায় টেংরাগিরি বনাঞ্চল নামেও পরিচিত।
➣ শুঁটকি পল্লি: জেলার কলাপারা উপজেলায় অবস্থিত। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ৭ কিলোমিটার পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে শুঁটকি পল্লি।
➣ বাউফলের মৃৎশিল্প: বাউফল উপজেলা অবস্থিত। বাউফলের মৃৎশিল্পীদের তৈরি বিলাসসামগ্রী বিশ্ববাজারে সমাদৃত। রপ্তানি হয় ইটালি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ইউকে, স্পেন , জাপান, ইউএস ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে। দশমিনা বীজ উৎপাদন খামার: দশমিনা উপজেলা অবস্থিত। ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ খামারটি তৈরির কাজ শুরু হয়। এবং একই বছর উদ্বোধন করা হয়। খামারটি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
➣ চর বিজয়: জেলার কলাপারা উপজেলার কুয়াকাটাতে অবস্থিত। গভীর সাগরে জেগে ওঠা মনোমুগ্ধকর এক দ্বীপ চর বিজয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে চরটির নামকরণ করা হয় চর বিজয়। যা স্থানীয়দের কাছে হাইরের চর নামে পরিচিত।
➣ খেপুপাড়া ডপলার রাডার স্টেশন: জেলার কলাপারা উপজেলা অবস্থিত। ১৯৬৯ সালে স্টেশন স্থাপিত হয়। ২০০৮ সালে স্টেশনটিতে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ডপলার রাডার স্থাপন করা হয়।
➣ দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন: জেলার কুয়াকাটায় অবস্থিত। ২০১৩ সালে স্টেশনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১৬ সালে এটি সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হয়।
➣ শেখ হাসিনা সেনানিবাস: জেলার লেবুখালীতে নির্মিত সেনানিবাসটি ২০১৮ সালে দেশের ৩১তম সেনানিবাস হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
➣ পায়রা সেতু: লেবুখালীতে পায়রা নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি দেশের পঞ্চম বৃহত্তম সেতু। এটি লেবুখালী সেতু নামেও পরিচিত। ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। চার লেনবিশিষ্ট সেতুটি ‘এক্সট্রাডোজড কেবল স্টেইড’ প্রযুক্তিতে নির্মিত। দৈর্ঘ্য- ১৪৭০ মিটার এবং প্রস্থ- ১৯ দশমিক ৭৬ মিটার। স্প্যান- ৩২ ও পিয়ার- ৩১টি। দেশে প্রথমবারের মতো এই সেতুতে ‘ব্রিজ হেলথ মনিটর’ স্থাপিত হয়। ২০১২ সালের মে মাসে সেতু নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এছাড়া রয়েছে মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দির, জমিদার মহেন্দ্র ও রাজেন্দ্র রায় চৌধুরী কাছারি বাড়ি, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, কেরানীপাড়া রাখাইনপল্লি, গঙ্গা-মতির জঙ্গল, মিয়াবাড়ী মসজিদ, রাজ্জাক বিশ্বাসের সাপের খামার, নারিকেল কুঞ্জ, লেম্বুর চর, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের পৈত্রিক নিবাস কাজী বাড়ি (বিলবিলাস), ঘসেটি বেগমের কুঠিবাড়ি, শেখ কামাল সেতু, সিজি বেইস ‘অগ্রযাত্রা’।
➣ নদ-নদী: লাউকাঠি, লোহালিয়া, আন্ধারমানিক, পায়রাগঞ্জ, তেতুলিয়া, পাঙ্গাশিয়া, আগুনমুখা।
➣ নৃগোষ্ঠী: মগ, চাকমা, রাখাইন।
➣ আয়তন: ৩২২১ দশমিক ৩১ বর্গ কিলোমিটার।
➣ জনসংখ্যা: ১,৭২৭,২৫৪ জন (জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২)।
➣ উপজেলা: ৮টি (সদর, মির্জাগঞ্জ, বাউফল, দুমকী, দশমিনা, গলাচিপা, কলাপাড়া, রাঙাবালী)।
➣ পৌরসভা: ৫টি (পটুয়াখালী, গলাচিপা, বাউফল, কলাপাড়া, কুয়াকাটা)।
➣ ইউনিয়ন: ৭৬টি।
➣ সংসদীয় আসন: ৪টি (আসন- ১১১, ১১২, ১১৩, ১১৪ বা পটুয়াখালী-১, ২, ৩, ৪)।
➣ বিশ্ববিদ্যালয়: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
➣ জেলা ব্র্যান্ডিং: কুয়াকাটা অন্যন্যা পটুয়াখালী সাগরকন্যা।