হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শেষ সীমায় অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযের লীলাভূমি পঞ্চগড় জেলা। এটি দেশের সর্বোত্তরের জেলা। এবং দেশের সর্বোত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়া ও স্থান বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট এই জেলায়। উত্তরের প্রবেশদ্বার সবুজ চায়ের সমাহার (জেলা ব্র্যান্ডিং) খ্যাত জেলাটি দেশের রংপুর বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল।
❖ পঞ্চগড় জেলার ভৌগোলিক পরিচিতি:
স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ কর্তৃক ১৯৪৭ সালের সীমান্ত বণ্টন নীতি অনুযায়ী এই জেলার সীমান্ত রেখা অত্যন্ত আঁকাবাঁকা ও ভংগুর। জেলার তিন দিকে ভারতীয় সীমান্ত। জেলাটির সঙ্গে ভারতের সীমান্ত এলাকার দৈর্ঘ্য ২৮৬.৮৭ কিলোমিটার। জেলার উত্তরে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুঁড়ি। উত্তর পূর্ব ও পূর্বে জলপাইগুঁড়ি ও কুচবিহার এবং বাংলাদেশের নীলফামারী জেলা। পশ্চিমে ভারতে পুর্নিয়া ও উত্তর দিনাজপুর এবং দক্ষিণ। দক্ষিণ পূর্বে ঠাকারগাঁও ও দিনাজপুর জেলা।
❖ নামকরণ:
ঐতিহাসিকদের মতে, এ অঞ্চলটি অতি প্রাচীনকালে ‘পুন্ডুনগর রাজ্যের অর্ন্তগত ‘পঞ্চনগরী’ নামে একটি অঞ্চল ছিল। কালক্রমে পঞ্চনগরী ‘পঞ্চগড়’ নামে পরিচিতি পায়। ‘পঞ্চ’ (পাঁচ) গড়ের সমাহার ‘পঞ্চগড়’ নামটির অপভ্রংশ ‘পঞ্চগড়’ দীর্ঘকাল এই জনপদে প্রচলিত ছিল। পঞ্চগৌড়ের একটি অংশ হিসেবে প্রাকৃত ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পঞ্চগড়ের নামকরণের সম্ভাবনা রয়েছে। বহুল প্রচলিত মত হলো, এই অঞ্চলের পাঁচটি গড়ের সুস্পষ্ট অবস্থানের কারণে পঞ্চগড় নামটির উৎপত্তি। গড়গুলো হচ্ছে- ভিতরগড়, মীরগড়, হোসেনগড়, রাজনগড় ও দেবেনগড়।
❖ ইতিহাস:
পঞ্চগড় একটি প্রাচীন জনপদ। প্রাচীন ও মধ্য যুগে এই ভূখণ্ডের পাশে ছিল মগধ, মিথিলা, গৌর, নেপাল, ভূটান, সিকিম ও আসাম রাজ্যের সীমান্ত। এই ভূখণ্ডটি পর্যায়ক্রমে শাসিত হয়েছে প্রাগ- জ্যোতিষ, কামরূপ, কামতা, কুচবিহার ও গৌর রাজ্যের রাজা, বাদশা, সুবাদার এবং বৈকুন্ঠপুর অঙ্গ- রাজ্যের দেশীয় রাজা ও ভূ-স্বামীদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে। মৌর্য, গুপ্ত ও পাল (দেবপাল এবং ধর্মপাল) রাজন্যবর্গও শাসন করেছিলেন এই অঞ্চল। সুলতান জালাল উদ্দিন ফাতেশাহ, সুলতান বারবক শাহ, শেরশাহ, খুররম খাঁ (শাহজাহান), মীরজুমলা, সুবাদার ইব্রাহীম খাঁ ফতে জঙ্গ এবং দেবী চৌধুরাণী, ভবানী পাঠক, ফকির মজনুশাহ প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত পঞ্চগড় জনপদের নাম ও স্মৃতি।
❖ জেলা গঠন:
ষোড়শ শতকে কুচবিহার রাজ্য গঠিত হওয়ার পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অঞ্চলটি মূলত কোচ রাজন্যবর্গের দ্বারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাসিত হয়েছে। বৃটিশ শাসনামলে জেলাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত ছিল। ১৯১১ সালে জলপাইগুড়ি জেলা একটি পূর্ণাঙ্গ থানা হিসাবে আত্নপ্রকাশ করে। ঐ সময়ে থানাটির সদর দপ্তর বর্তমান পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পঞ্চগড় থানাটি দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমার অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও মহকুমার পাঁচটি থানা- তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় সদর, আটোয়ারী, বোদা ও দেবীগঞ্জ নিয়ে পঞ্চগড় মহকুমা সৃষ্টি হয়। এ মহকুমার সদর দপ্তর স্থাপিত হয় পঞ্চগড় থানায়। ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড় মহকুমা জেলা হিসেবে ঘোষিত হয়। প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন আ.স.ম. আব্দুল হালিম (১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৮৫ সালের ১৬ জুন)।
❖ পঞ্চগড় জেলার ঐতিহ্য ও স্থাপনা
∎ বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর: দেশের সর্বউত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়া। এই উপজেলার বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। মহানন্দা নদীর তীর ও ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন স্থলবন্দরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৭ সালে। এ বন্দরের মাধ্যমে ভারত ও নেপালের সাথে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এটি দেশের একমাত্র স্থলবন্দর যেটির মাধ্যমে ৩টি দেশের সঙ্গে (ভারত, নেপাল, ভুটান) বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
∎ রকস মিউজিয়াম: ১৯৯৭ সালে পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ চত্ত্বরে তৎকালীন অধ্যাপক ডক্টর নাজমুল হক প্রতিষ্ঠিত করেন দেশের একমাত্র প্রস্তর যাদুঘর ‘রকস মিউজিয়াম’। মিউজিয়ামটিতে প্রত্নতাত্ত্বিক ও লোকজ সংগ্রহ রয়েছে এক হাজারের বেশি।
∎ মির্জাপুর শাহী মসজিদ: মসজিদটি আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত। ধারণা করা হয়, মোঘল সম্রাট শাহ আলমের রাজত্বকালে এটির নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
∎ বদেশ্বরী মন্দির: জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নে এটি অবস্থিত। মন্দিরটির নাম অনুযায়ী বোদা উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে।
∎ বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট: তেঁতুলিয়া উপজেলার ১ নং বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত দেশের সর্বোত্তরের স্থান বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট।
∎ ডাক বাংলো: তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরের অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘ডাক বাংলো’। এর নির্মাণ কৌশল ভিক্টোরিয়ান ধাচের। কুচবিহারের রাজা এটি নির্মাণ করেন। পাশাপাশি তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত একটি পিকনিক কর্ণার রয়েছে। উক্ত স্থান হতে হেমন্ত ও শীতকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
∎ পঞ্চগড় সুগার মিলস লি: ১৯৬৯ সালে পঞ্চগড় সদর উপজেলায় এটি স্থাপিত হয়। মিলটি ১৯৬৯-৭০ সালে চিনি উৎপাদন শুরু করে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের অধীনে মিলটি সরকারি মালিকানায় রয়েছে।
এছাড়া রয়েছে মহারাজার দিঘী, ভিতরগড়, মিরগড়, বার আউলিয়া মাজার, গোলকধাম মন্দির, কাজলদিঘী, কাজী এন্ড কাজী চা বাগান।
∎ চা শিল্প: ২০০০ সালে জেলাটিতে চা চাষ শুরু হয় । বর্তমানে ৯টি এস্টেটসহ ৩২৭টি প্লটে চা চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে চা বাগান রয়েছে ২০৮টি। মোট ৫টি চা ফ্যাক্টরী চালু রয়েছে। পঞ্চগড়ের অর্গানিক চা ইউরোপ-আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
❖ ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতান: ১৯২৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলায় জন্ম। তিনি ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম কালো পতাকা উত্তোলনকারী ছাত্র। ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রকাশ করেন তিনি। ১৯৮৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
❖ এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম: জেলার বোদা থানার ময়দান দীঘি ইউনিয়নে চল্লিশের দশকে জন্ম গ্রহণ করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা এবং সর্বোপরি ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে পঞ্চগড় থেকে নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ৬ নং সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা হিসেবে পালন করেন। ১৯৯৭ সালে ২ জুন মৃত্যুবরণ করেন।
❖ চিত্রনায়ক আব্দুর রহমান: উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচিত্র অভিনেতা আব্দুর রহমান ওরফে নায়ক রহমান জেলার আটোয়ারী উপজেলার রসেয়া গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবি- তালাস, জোয়ার-ভাটা, আমার সংসার, মিলন।
এছাড়া রয়েছে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ, মির্জা গোলাম হাফিজ।
❖ নদ-নদী: জেলার উল্লেখযোগ্য নদ-নদী হলো- করতোয়া, ডাহুক, মহানন্দা, তালমা, পাঙ্গা, আত্রাই ও চাওয়াই নদী।
❖ নৃ-গোষ্ঠী: সাঁওতাল, রাজবংশী, কোচ, পলিয়া, ওঁরাও ও সুনরী।
❖ বিশেষ অর্জন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২২ সালের ২১ জুলাই এই জেলাকে প্রথম ভুমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত জেলা হিসেবে ঘোষণা করেন। এছাড়া জেলার ৫টি উপজেলায় ২০১১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম পর্যায়ে ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচী বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়।
❖ একনজরে
• আয়তন: ১৪০৪.৬৩ বর্গ কিলোমিটার।
• জনসংখ্যা: ১,১৭৯,৮৪৩ জন (জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২)।
• শিক্ষার হার: ৭৩.৫৯ শতাংশ (জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২)।
• সংসদীয় আসন: ২টি।
• উপজেলা: ৫টি (তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় সদর, আটোয়ারী, বোদা ও দেবীগঞ্জ)।
• পৌরসভা: ২টি।
• থানা: ৫টি।
• ইউনিয়ন: ৪৩টি।
• মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর: ৬ নং সেক্টর।
• পাক বাহিনী মুক্ত: এ জেলা সম্পূর্ণরূপে পাক বাহিনী মুক্ত হয় ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর।
• জেলা ব্র্যান্ডিং: উত্তরের প্রবেশদ্বার সবুজ চায়ের সমাহার।