সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যমণ্ডিত দিনাজপুরের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ছোট নাগপুর, বিন্ধ্যা পর্বত প্রভৃতি লাখ লাখ বছরের প্রাচীন স্থানগুলোর মৃত্তিকার সমগোত্রীয় দিনাজপুরের মাটি। বহুকাল পূর্বে হিমালয় পর্বতের ভগ্নীরূপে জন্ম নেয়া বরেন্দ্র ভূমির হৃদয়-স্থানীয় স্থান দিনাজপুর।
❖ ভৌগোলিক অবস্থান:
দিনাজপুর জেলা (১৩ টি উপজেলা নিয়ে গঠিত) রংপুর বিভাগের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এ জেলার গড় উচ্চতা ১১২ ফুট থেকে ১২০ ফুট। উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত দিনাজপুর জেলার উত্তরে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলা, দক্ষিণে গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট জেলা, পূর্বে নীলফামারী ও রংপুর জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য।
❖ নামকরণ:
লোকশ্রুতি অনুযায়ী জনৈক দিনাজ অথবা দিনারাজ দিনাজপুর রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তার নামানুসারেই রাজবাড়ীতে অবস্থিত মৌজার নাম হয় দিনাজপুর। পরবর্তীতে বৃটিশ শাসনামলে ঘোড়াঘাট সরকার বাতিল করে বৃটিশরা নতুন জেলা গঠন করে এবং রাজার সম্মানে এ জেলার নামকরণ করে দিনাজপুর। কোম্পানি আমলের নথিপত্রে প্রথম দিনাজপুর নামটি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। তবে ভৌগোলিকভাবে দিনাজপুর মৌজাটি অতি প্রাচীন। দিনাজপুরের ভূতপূর্ব কালেক্টর ও বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ মি: ওয়েষ্ট মেকট সর্বপ্রথম দিনাজপুর নাম ও তার উৎস উদঘাটন করেন বলে প্রসিদ্ধি আছে।
❖ ইতিহাস:
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সূচনায় সৃষ্ট আদি জেলা শহরগুলির অন্যতম দিনাজপুর। জেলাটির পূর্বনাম ছিল ঘোড়াঘাট জেলা। ১৭৬৫ সালে ইংরেজ সেনাপতি মিঃ কোট্রিল ঘোড়াঘাটের শেষ মুসলিম ফৌজদার করম আলী খানকে পরাজিত করে এই অঞ্চলে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এ অঞ্চলে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ইংরেজরা ১৭৮৬ সালে নতুন জেলা গঠন করে এবং ১৭৯৩ সালে দিনাজপুরে জেলার দপ্তর স্থাপন করে। ১৮৩৩-১৮৭০ সালে দিনাজপুরের বিভিন্ন অংশ পূর্ণিয়া, রংপুর ও রাজশাহীর অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ইংরেজ শাসিত ভারতের বুকে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি আলাদা রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে। ঐ সময়ে রাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুসারে এ জেলার দশটি থানা ভারতের পশ্চিম বাংলা প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত হয় এবং পশ্চিম দিনাজপুর জেলা গঠন করে। অপরদিকে পশ্চিম বাংলার জলপাইগুড়ি জেলা হতে তেতুলিয়া, পঞ্চগড়, বোদা, দেবীগঞ্জ ও পাটগ্রাম থানা দিনাজপুরের সাথে যুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সরকার শাসনকার্যের সুবিধার্থে পাটগ্রাম থানাটি রংপুরের সাথে এবং দিনাজপুরের দক্ষিণ অংশের ধামইর, পোরশা ও পত্নিতলা থানা তিনটি তৎকালীন রাজশাহীর নওগাঁ মহকুমার সাথে যুক্ত করে। সর্বশেষ দিনাজপুরের দুটি মহকুমা ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় ১৯৮৪ সালে পৃথক জেলায় পরিণত হয়।
❖ মুঘল ও কোম্পানি আমলে দিনাজপুর
মুঘল আমলে বাংলা বিজয়ের পর সমগ্র বাংলাদেশকে ২৪টি সরকারে ভাগ করা হয়। এতে দিনাজপুরে ঘোড়াঘাট, বরকাবাদ, তাজপুর এবং পিঞ্জরা নামের ৪টি সরকার অন্তর্ভুক্ত হয়। সবদিক বিবেচনায় বাংলার ঘোড়াঘাট শ্রেষ্ঠ সরকার ছিল। ঘোড়াঘাটের শেষ ফৌজদার ছিলেন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ’মোজাফফরনামা’ রচয়িতা করম আলী খান। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি গ্রহণের ফলে দিনাজপুর জেলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণভুক্ত হয়। সেই সময় লক্ষনৌতী বা জিন্নাতাবাদ, তেজপুর, পানজারা, ঘোড়াঘাট, বারবকাবাদ ও বাজুহা, এই ছয়টি সরকারের অংশ নিয়ে দিনাজপুর জেলা গঠিত হয়। ১৭৮৬ সালে দিনাজপুর জেলা হিসেবে ঘোষিত হয়। দিনাজপুর সদরে জেলা সদর গঠিত হয়।
❖ কান্তজীউ মন্দির: ১৮ শতকে নির্মিতটি মন্দিরটি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার ঢেপা নদীর তীরে অবস্থিত। এটির অন্য নাম নবরত্ন মন্দির। টেরাকাটা অলঙ্কার এবং ইন্দো-পারস্য স্থাপনা কৌশলে এটি নির্মিত। মহারাজা প্রাণনাথ ১৭০৪ সালে মন্দিরটি নির্মাণ শুরু করেন। ১৭২২ সালে প্রাণনাথের মৃত্যুর হলে তাঁর পুত্র রাজ রামনাথ রায় ১৭৫২ সালে নির্মাণ কাজ শেষ করেন। ঐতিহাসিক বুকানন হ্যামিলটনের মতে, কান্তজিউ বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দরতম মন্দির।
❖ নয়াবাদ মসজিদ: দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের প্রবেশদ্বারের ওপরে ফারসি ভাষায় রচিত লিপির তথ্য মতে, সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের ১৭৯৩ সালে মসজিদটি নির্মিত হয়।
❖ রামসাগর দিঘি: দেশের বৃহত্তম দিঘি হিসেবে পরিচিত জলাশয়টি একটি কৃত্রিম দিঘি। রাজা রামনাথ রাজ্যের পানির চাহিদা মেটাতে আলীবর্দীখানের সময়ে ১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ সালের মধ্যে দিঘিটি খনন করেন। তাঁর নামেই দিঘিটি পরিচিতি পায়। বর্তমানে এটি দিনাজপুর পর্যটন বিভাগের দায়িত্বে আছে।
❖ নবাবগঞ্জ জাতীয় উদ্যান: জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার পঞ্চবটীর বনটি জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পায় ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর। বর্তমানে শালবনটি শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান নামে পরিচিত। বনের মাঝখানে আশুরার বিল দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম। বিলের ওপরে নির্মিত হয়েছে উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ কাঠের ব্রিজ।
❖ ফুলবাড়ি দুর্গ: জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার কাটাবাড়ি মৌজার ফুলবাড়ি দুর্গটি অবস্থিত। ১৮৫৯-এর রেভিনিউ সার্ভে মানচিত্রে এ দুর্গের নাম গড় গোবিন্দ লেখা আছে।
❖ স্বপ্নপুরী: একটি পিকনিক স্পট। নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নে অবস্থিত। ১৯৮৯ সালে কাজ শুরু হয়।
❖ দীপশিখা মেটি স্কুল: স্কুলটির খ্যাতি মাটি ও বাঁশ দিয়ে ভিন্নধর্মী নির্মাণশৈলীর জন্য। এ কারণে স্কুলটি ২০০৭ সালে আগা খান আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। এটি জেলার বিরল উপজেলার মঙ্গলপুর ইউনিয়নের রুদ্রাপুর গ্রামে অবস্থিত। ‘দীপশিখা’ নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ১৯৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর রুদ্রাপুর গ্রামের ছোট্ট পরিসরে ‘মেটি স্কুল’ গড়ে তোলে।
❖ সিংড়া জাতীয় উদ্যান: সিংড়া শালবনের মোট আয়তন ৩৫৫ হেক্টর। বীরগঞ্জ উপজেলার ৮নং ভোগনগর ইউনিয়নে অবস্থিত। ২০১০ সালে ‘সংরক্ষিত এলাকা’ ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
❖ চেহেলগাজী মসজিদ ও মাজার: মসজিদ ও মাজার জেলার সদর থানার চেহেলগাজী গ্রামে অবস্থিত। ১৪৬০ সালের ১ ডিসেম্বর মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের রাজত্বকালে (১৪৫৯-১৪৭৪ সালে) তাঁর উজির ইকরাব খানের নির্দেশে পূর্ণিয়া জেলার অন্তর্গত জোর ও বারুক (দিনাজপুর) পরগণার শাসনকর্তা (ফৌজদার ও জংদার) উলুঘ নুসরত খান এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। তবে মাজারটি মসজিদ নিমার্ণের পূর্ব থেকে ছিল।
❖ ঘোড়াঘাট দূর্গ: দূর্গটি জেলার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে করতোয়া নদীর ডান তীরে অবস্থিত।
❖ সীতাকোট বিহার: জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত একটি বৌদ্ধ বিহার।
❖ সুরা মসজিদ: জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার সুরায় অবস্থিত।
❖ বিখ্যাত ব্যক্তি: খাঁন বাহাদুর মাহতাব উদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশের প্রথম মুসলিম নারী ডাক্তার আনোয়ারা খাতুন, এস এ বারী, নৃত্যশিল্পী লায়লা সামাদ, ডাঃ সুকুমার সেন গুপ্ত, ফুটবল যাদুকর সামাদ, ডক্টর গোবিন্দ চন্দ্র দেব, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, কবি নুর মোহাম্মদ, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, মির্জা কাদের বকস।
❖ বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি: জেলার পার্বতীপুর উপজেলায় বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড অবস্থিত। খনিটি আবিষ্কার হয় ১৯৮৫ সালে।
❖ মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্প: জেলার পার্বতীপুর উপজেলার মধ্যপাড়া এলাকায় ১৯৭৪ সালে গ্রানাইট পাথর আবিস্কৃত হয়। ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
❂ প্রধান নদী
❖ নদ-নদী: ছোট যমুনা, পুনর্ভবা, আত্রাই, করতোয়া, তুলসীগঙ্গা, ইছামতি, কাঁকড়া, টাঙ্গন, তুলাই, টেপা, পাথরঘাটা নদী প্রভৃতি।
❖ ভাষা ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান: শিশু একাডেমি, দিনাজপুর সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়, দিনাজপুর মিউজিয়াম, খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল ও পাবলিক লাইব্রেরি।
❖ উপজেলা: ১৩টি (বোচাগঞ্জ, বিরল, কাহারোল, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর সদর, খানসামা, চিরিরন্দর, ফুলবাড়ী,পার্বতীপুর, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর, ঘোড়াঘাট)।
❖ লিচু: এ জেলা লিচুর জন্য বিখ্যাত। জেলাটিতে দেশের সেরা লিচু উৎপন্ন হয়। উৎপাদিত উল্লেখযোগ্য লিচু হলো- মাদ্রাজী, বোম্বাই, বেদানা ও চায়না-৩। প্রায় ১৫০০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়।
❖ সুগন্ধি ধান/চাল: সুগন্ধি ধান/চাল উৎপাদনে জেলাটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ জেলায় নানাজাতের সুগন্ধি ধান জন্মে। তন্মধ্যে ব্রিধান-৩৪, কাটারী, জিরা কাটারী (চিনি গুড়া), ফিলিপিন কাটারী, চল্লিশাজিরা, বাদশা ভোগ, কালোজিরা, জটা কাটারী, চিনি কাটারী, বেগুন বিচি ও ব্রিধান-৫০ উল্লেখযোগ্য।
❂ প্রধান শস্য
❖ কৃষি শস্য: ধান, গম, ইক্ষু, পাট, আলু, সবজি, পিঁয়াজ, আদা, তৈলবীজ।
❂ একদৃষ্টিতে
❖ আয়তনঃ ৩,৪৪৪.৩০ বর্গ কিলোমিটার।
❖ জনসংখ্যাঃ ৩৩,১৫,২৩৮ জন (জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী)।
❖ শিক্ষার হারঃ ৭৬.০৪ (জনশুমারী ২০২২ অনুযায়ী)।
❖ সংসদীয় আসনঃ ৬টি।
❖ পৌরসভঃ ৯টি।
❖ থানাঃ ১৩টি।
❖ ইউনিয়নঃ ১০৩টি।
❖ মুক্তিযুদ্ধে সেক্টরঃ ৬ ও ৭ নং।
❖ বিশ্ববিদ্যালয়ঃ হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।