লর্ড লরেন্স মুলত প্রাদেশিক গভর্নরদের সঙ্গে পরামর্শ করে পুঁথি সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। বঙ্গীয় এশিয়াটিক সোসাইটি রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সাহায্যে পুঁথি সংগ্রহের কাজ শুরু করে। রাজেন্দ্রলাল মিত্র নেপালে গিয়ে সংস্কৃত ভাষায় রচিত অনেকগুলো বৌদ্ধ ধর্ম ও সাহিত্যের পুঁথি প্রাপ্ত হন। তিনি ১৮৮২ সালে ‘The Sanskrit Buddhist Literature of Nepal’ গ্রন্থে পুঁথিগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেন (Sanskrit Buddhist Literature in Nepal, বাজারে প্রকাশিত সকল চাকরির বইয়ে নামটি এভাবে দেওয়া আছে যেটি ভুল)। ১৮৯১সালে ২৬ জুলাই তাঁর মৃত্যুর পর বঙ্গীয় এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলা-বিহার-আসাম-উড়িষ্যা অঞ্চলের পুঁথি সংগ্রহের দায়িত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে। তিনি ১৮৯৭ ও ১৮৯৮ সালে নেপাল যান। ১৯০৭ সালে তৃতীয়বার নেপাল গিয়ে নেপালের রাজ দরবার গ্রন্থাগার (রয়েল লাইব্রেরি) থেকে ৪টি পুঁথি সংগ্রহ করেন।
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজ গ্রন্থাগার থেকে যে ৪টি পুঁথি সংগ্রহ করেন; সেগুলো হলো- ১.চর্যাচর্যবিনিশ্চয় ২. সরহব্রজের দোহাকোষ ৩. কাহ্নপাদের দোহাকোষ ৪. ডাকার্ণব। ১৯১৬ (১৩২৩ সনে) সালে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে এই ৪টি পুঁথি একখণ্ডে প্রকাশিত হয়। এটিই পরে ‘চর্যাপদ’ নামে পরিচিতি পায়।
চর্যাপদের রচনাকাল
ড. মুহম্মদ শহীদল্লাহ্ মতে, চর্যাপদ রচিত হয়–– ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে (সপ্তম/অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে)।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, চর্যাপদ রচিত হয়–– ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দে।
ড. সুকুমার সেনের মতে, চর্যাপদ রচিত হয়–– ৯০০ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দে।
➣ চর্য অর্থ–– পালনীয়, আচরণীয়, অনুষ্ঠেয়।
➣ চর্যাপদের মূল অর্থ হলো––‘কোনটি আচরণীয়, কোনটি আচরণীয় নয়’।
➣ বাংলা সাহিত্যের প্রথম, প্রাচীন ও আদি নিদর্শন–– চর্যাপদ।
➣ চর্যাপদ হলো––কতগুলো পদ, কবিতা বা গানের সংকলন।
➣ বাংলা ভাষায় লেখা–– প্রথম সাহিত্যিক নিদর্শন।
➣ বৌদ্ধ সাধকদের দ্বারা রচিত হয়–– দশম শতকে।
➣অনেকের মতে, এটি ‘গানের সংকলন’ যেটি রচিত–– সন্ধ্যা ভাষায়/ আলো-আঁধারি ভাষায়।
➣ চর্যাপদের ভাষাকে ‘আলো-আঁধারি’ বলে অভিহিত করেন–– হরপ্রাসাদ শাস্ত্রী।
➣ চর্যাপদে মোট পদ–– ৫১টি।
➣ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যে মূল পুঁথিটি পান তাতে পদ ছিল––সাড়ে ৪৬টি।
➣ চর্যাপদের পাওয়া যায়নি–– ৩টি পদ (২৪, ২৫ ও ৪৮তম পদ)।
➣ চর্যাপদের ২৩তম পদের পাওয়া যায়নি–– শেষাংশ।
➣ চর্যাপদের প্রকৃত নাম–– চর্যাচর্যবিনিশ্চয় বা চর্যাগীতিকোষ।
➣ চর্যাপদের রচয়িতা–– বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ/বৌদ্ধ সহজিয়াগণ।
➣ ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে নেপালে প্রাপ্ত তালপাতার পুঁথি সম্পর্কে প্রকাশিত তালিকার নাম ছিলো–– A Catalogue of Palm Leaf and selected Paper MSS belonging to the Durbar Library, Nepal।
➣ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক ১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘Origin and Development of the Bengali Language’ গ্রন্থে প্রথম আলোচনা করেন চর্যাপদের–– ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে।
➣ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ চর্যাপদের ধর্মমত সম্পর্কে প্রথম আলোচনা করেন––১৯২৭ সালে।
➣ হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’য় ছিল–– ধর্মসম্বন্ধীয় বিধিনিষেধ––বিষয়ক কিছু গান ও দোহা।
➣ ধর্মসম্বন্ধীয় বিধিনিষেধগুলোর নাম–– চর্যাচর্যবিনিশ্চয়।
✔ ‘অপণা মাংসে হরিণা বৈরী’লাইনটি পাওয়া যায়–– চর্যাপদে।
✔ চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত এটি প্রথম প্রমাণ করেন––ড.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।
✔ চর্যাপদের সর্বাধিক পদ রচনাকারী–– কাহ্নপা (রচিত পদ ১৩টি)।
✔ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতে, চর্যাপদের ভাষা–– বঙ্গ-কামরূপী।
✔ চর্যাপদের পদগুলোকে টীকার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন–– মুনিদত্ত।
✔ চর্যাপদ লেখা–– মাত্রাবৃত্ত ছন্দে।
✔ চর্যাপদ রচিত হয়–– পাল আমলে।
✔ চর্যাপদের যে কবি নিজেকে বাঙালি বলে দাবি করেন–– ভুসুকুপা (রচিত পদ ৮টি)।
✔ সরহপা রচিত পদ–– ৪টি।
✔ কুক্কুরীপা রচিত পদ––৩টি।
✔ লুইপা, শান্তিপা, শবরপা ২টি করে এবং অন্যরা রচনা করেন–– ১টি করে পদ।
✔ চর্যাপদের তিব্বতি অনুবাদ নেপাল থেকে আবিষ্কার করেন––ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী।
✔ ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী কর্তৃক আবিষ্কৃত চর্যাপদের তিব্বতি অনুবাদে পদের সংখ্যা––৫১টি।
✔ চর্যাপদের সংস্কৃত টীকা আবিষ্কার হয়––নেপাল থেকে।
সুকুমার সেন তাঁর ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ (১ম খণ্ড) গ্রন্থে উল্লেখ করেন চর্যাপদের কবির সংখ্যা–– ২৪ জন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সম্পাদিত ‘Buddhist Mystic Songs’ গ্রন্থে তিনি চর্যাপদের কবির সংখ্যা উল্লেখ করেন––২৩ জন।
অধিকাংশ পণ্ডিতেরমতে চর্যাপদের কবির সংখ্যা–– ২৪ জন।
চর্যাপদেরপ্রধানকবিগণহলেন––লুইপাদ, কাহ্নপাদ, ভুসুকুপাদ, শবরপাদ।
নেপাল রাজদরবারে প্রাপ্ত সংকলিত গ্রন্থটির নাম ছিল ‘চর্যাগীতিকোষ’। গ্রন্থের আবিষ্কর্তা হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এটির নতুন নামকরণ করেন ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’। ‘চর্যাগীতিকোষ’ গ্রন্থটি মূলত টীকা বা ভাষ্য রচনা।
চর্যাপদের তিব্বতী অনুবাদকের নাম ‘মুনিদত্ত’। মুনিদত্তের টীকানুসারে ‘চর্যাগীতিকোষ’-এর অন্য নাম ‘আশ্চর্যচর্যাচয়’। তিব্বতী অনুবাদ অনুসারে মুনিদত্ত মোট ৫০টি চর্যার টীকা রচনা করেন।
➣ অপণা মাংসে হরিণা বৈরী (৬নং পদ, ভুসুকুপা)।
অর্থ: হরিণের মাংসই তার জন্য শত্রু।
➣ হাথেরে কাঙ্কণ মা লোউ দাপণ (৩২নং পদ, সরহপা)।
অর্থ: হাতের কাঁকন দেখার জন্য দর্পণ প্রয়োজন হয় না।
➣ হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী (৩৩নং পদ, ঢেণ্ডণপা)।
অর্থ: হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন প্রেমিকরা এসে ভীড় করে।
➣ দুহিল দুধু কি বেন্টে সামাই (৩৩নং পদ, ঢেণ্ডণপা)।
অর্থ: দোহন করা দুধ কি বাটে প্রবেশ করানো যায়?
➣ বর সূণ গোহালী কিমো দুধ বলন্দে (৩৯নং পদ, সরহপা)।
অর্থ: দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।
➣ আণ চাহন্তে আণ বিণঠা (৪৪নং পদ, কঙ্কণপা)।
অর্থ: অন্য চাহিতে, অন্য বিনষ্ট।