১৯৯২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডসের ম্যাসট্রিটে সাক্ষরিত হয় ‘ম্যাসট্রিট চুক্তি’। ১৯৯৩ সালের ১ নভেম্বর এই চুক্তি কার্যকরের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’। সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ঐতিহাসিক। এর পূর্ব ইতিহাস হলো-
➢ ১৯৫১ সালের ১৮ এপ্রিল ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গ-এই ৬টি দেশের সমন্বয়ে ‘প্যারিস চুক্তি’ সাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫২ সালের ২৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত ইউনিয়ন (ECSC- European Coal and Steel Community)। যা ইউরোপীয় ফেডারেশনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
➢ ১৯৫৭ সালের ২৫ মার্চ ‘ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গ’ এই ৬টি দেশের মধ্যে সাক্ষরিত হয় ‘রোম চুক্তি’। এ চুক্তির ফলে ‘ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত ইউনিয়ন’ বর্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইউরোপীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন’ (EEC- The European Economic Community) এবং ‘ইউরোপীয় আণবিক শক্তি ইউনিয়ন’ (Euratom-The European Atomic Energy Community)। ১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি চুক্তিটি কার্যকর হয়।
➢ ১৯৬৫ সালের ৮ এপ্রিল বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সাক্ষরিত হয় ‘ব্রাসেলস চুক্তি’। চুক্তিটি Merger Treaty নামেও পরিচিত। এটি কার্যকর হয় ১৯৬৭ সালের ১ জুলাই। চুক্তির স্বাক্ষরের উদ্দেশ্য ছিল the European Coal and Steel Community (ECSC), European Atomic Energy Community (Euratom) and the European Economic Community (EEC) এই ৩টি ইউনিয়নকে একত্রিকরণ করা। এটিকে সাধারণত ‘ইউরোপীয় কমিউনিটি’ বলা হয়। তখন এর সদস্য ছিল ১২টি রাষ্ট্র।
➢ ১৯৭৩ সালে ইসির পরিধি বর্ধিত হয় যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও ডেনমার্কের যোগদানের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৯ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে প্রথম সরাসরি ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮১ সালে যোগ দেয় গ্রিস।
➢ ১৯৮৬ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি লুক্সেমবার্গে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারী নেদারল্যান্ডের হেগে সাক্ষরিত হয় ‘The Single European Act’। এই চুক্তির মাধ্যমে পর্তুগাল ও স্পেন যোগ দেয় সংস্থাটিতে। এছাড়া ইউরোপীয় পতাকা ব্যবহার শুরু হয় এবং একক ইউরোপীয় আইন সাক্ষরিত হয়।
➢ ১৯৯৭ সালের ২ অক্টোবর ‘আসস্টারডাম চুক্তি’ স্বাক্ষর হয়। ২০০১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘নাইচ চুক্তি’ স্বাক্ষর হয়। এটি কার্যকর হয় ২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর লিসবন চুক্তি কার্যকর হয়। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাঠামো নতুন করে তৈরি করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৩টি সম্প্রদায়ের জন্য অভিন্ন আইন তৈরি হয় এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি পদ তৈরি করে। এসব চুক্তি ও আইনের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশাল অর্থনৈতিক জোটে পরিণত হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শেনজেন চুক্তি
শেনজেন হলো লুক্সেমবার্গের ছোট্ট একটি গ্রাম। যা ফ্রান্স, জার্মানি ও লুক্সেমবার্গের সীমান্তে অবস্থিত। এই গ্রামে ১৯৮৫ সালের ১৪ জুন সাক্ষরিত হয় ‘শেনজেন চুক্তি’। এই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ৫টি দেশ নিজেদের মধ্যে থাকা অভ্যন্তরীণ সীমান্ত তুলে দেওয়ার বিষয়ে একমত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯০ সালে শেনজেন কনভেনশন সই হয়। ২৬ মার্চ ১৯৯৫ সালে শেনজেন এলাকা বাস্তবায়ন বা কার্যকর শুরু হয়। এরপর থেকে একে একে ২৭টি দেশ শেনজেনভুক্ত হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুদ্রা
ম্যাসট্রিট চুক্তির মাধ্যমে ১৯৯৯ সালে ১ জানুয়ারি চালু হয় মুদ্রা ‘ইউরো’। ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি প্রথম ইউরো ব্যাংক নোট ও পয়সা হিসেবে সেন্ট সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর জাতীয় মুদ্রা লোপ পায়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত ২৭টি দেশের মধ্যে ২০টি দেশ তাদের সরকারি মুদ্রা হিসেবে ‘ইউরো’ ব্যবহার করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাতটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করে। এগুলো হলো—
১. ইউরোপীয় কাউন্সিল: এটি ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ১৯৯২ ও ২০০৯ সালে কাউন্সিলের আইনে পরিবর্তন আনা হয়। ইউরোপীয় কাউন্সিল গঠিত হয় প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী নিয়ে। এর সদস্যরা একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন, যিনি দুই বা আড়াই বছরের মেয়াদ পর্যন্ত কাজ করতে পারেন। ইউরোপীয় কাউন্সিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চার্লস মিশেল। এর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে।
২. ইউরোপীয় কমিশন: ইউরোপীয় কমিশন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান নির্বাহী সংস্থা। এটি আইন প্রস্তাব করে, বাজেট পরিচালনা করে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে, প্রবিধান জারি করে এবং শীর্ষ সম্মেলনে, আলোচনায় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব করে। বর্তমানে এই কমিশনের নেতৃত্বে আছেন সাবেক জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী উরসুলা ভন ডার লিয়েন।
৩. ইউরোপীয় পার্লামেন্ট: এটি একমাত্র সরাসরি নির্বাচিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংস্থা। এটি ইইউ বাজেট নিয়ে আলোচনা ও অনুমোদন করে ও কমিশনের তত্ত্বাবধান করে। বর্তমানে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রবার্টা মেটসোলা। এর সদর দপ্তর ফ্রান্সের স্ট্রেসবার্গে। সদস্য ৭৫১ জন।
৪. মন্ত্রী পরিষদ: সমস্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশের সরকারি মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত হয় মন্ত্রী পরিষদ।
৫. ইউরোপীয় কোর্ট অব জাস্টিস: এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ বিচারিক কর্তৃপক্ষ যা এর আইন ব্যাখ্যা করে এবং বিরোধ নিষ্পত্তি করে। এর সদর দপ্তর লুক্সেমবার্গে।
৬. ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক: এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২০টি দেশের ইউরো মুদ্রা পরিচালনা করে এবং ইইউয়ের-এর মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করে। বর্তমানে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের দায়িত্বে আছেন ফরাসী রাজনীতিবিদ ক্রিস্টিন লাগার্ড। এর সদর দপ্তর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে।
৭. ইউরোপিয়ান কোর্ট অব অডিটরস: প্রতিষ্ঠানটি ইইউ বাজেটের নিরীক্ষা করে, তহবিল সঠিকভাবে ব্যয় করা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে এবং সংসদ, কমিশন এবং জাতীয় সরকারের কোনও জালিয়াতির বিষয়ে রিপোর্ট করে। এটির সদর দপ্তরও লুক্সেমবার্গে অবস্থিত।
❖ ব্রেক্সিট
ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বের হয়ে যাওয়াকে ব্রেক্সিট বলা হয়। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট প্রসঙ্গে দেশটিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জনগণ এর পক্ষে রায় দেয়। ফলে যুক্তরাজ্য ২০২০ সালে ৩১ জানুয়ারি ব্রেক্সিট কার্যকর করে।
❖ পুরস্কার
ইউরোপে গণতন্ত্র, শান্তি ও মানবাধিকার প্রচারের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশ ২৭টি। এগুলোর বিবরণ নিম্নরূপ-
১. অস্ট্রিয়া: ১৯৯৫ সাল থেকে ইইউ সদস্য দেশ, ১৯৯৯ সাল থেকে ইউরো এলাকার সদস্য, ১৯৯৭ সাল থেকে শেনজেন এলাকার সদস্য।
২. বেলজিয়াম: ইইউ সদস্য- ১৯৫৮ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ১৯৯৫ সালে।
৩. বুলগেরিয়া: ইইউ সদস্য- ২০০৭ সালে।
৪. ক্রোয়েশিয়া: ইইউ সদস্য- ২০১৩ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০২৩ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০২৩ সালে।
৫. সাইপ্রাস: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০০৮ সালে।
৬. চেকিয়া/চেকোস্লোভাকিয়া: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০০৭ সালে।
৭. ডেনমার্ক: ইইউ সদস্য- ১৯৭৩ সালে; শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০১ সালে।
৮. এস্তোনিয়া: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০১১ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০৭ সালে।
৯. ফিনল্যান্ড: ইইউ সদস্য- ১৯৯৫ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০১ সালে।
১০. ফ্রান্স: ইইউ সদস্য- ১৯৫৮ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ১৯৯৫ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সালে।
১১. জার্মানি: ইইউ সদস্য- ১৯৫৮ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ১৯৯৫ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সালে।
১২. গ্রীস: ইইউ সদস্য- ১৯৮১ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০০১ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০০ সালে।
১৩. হাঙ্গেরি: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০৭ সালে।
১৪. আয়ারল্যান্ড: ইইউ সদস্য- ১৯৭৩ সালে ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সালে।
১৫. ইতালি: ইইউ সদস্য- ১৯৫৮ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ১৯৯৭ সালে।
১৬. লাটভিয়া: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০১৪ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০৭ সালে।
১৭. লিথুনিয়া: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০১৫ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০৭ সালে।
১৮. লুক্সেমবার্গ: ইইউ সদস্য- ১৯৫৮ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ১৯৯৫ সালে।
১৯. মাল্টা: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০০৮ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০৭ সালে।
২০. নেদারল্যান্ড: ইইউ সদস্য- ১৯৫৮ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ১৯৯৫ সালে।
২১. পোল্যান্ড: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে ও ইউরো এলাকার সদস্য- ২০০৭ সাল।
২২. পর্তুগাল: ইইউ সদস্য- ১৯৮৬ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ১৯৯৫ সালে।
২৩. রোমানিয়া: ইইউ সদস্য- ২০০৭ সালে।
২৪. স্লোভাকিয়া: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০০৯ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০৭ সালে।
২৫. স্লোভেনিয়া: ইইউ সদস্য- ২০০৪ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ২০০৭ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০৭ সালে।
২৬. স্পেন: ইইউ সদস্য- ১৯৮৬ সালে; ইউরো এলাকার সদস্য- ১৯৯৯ সাল ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ১৯৯৫ সালে।
২৭. সুইডেন: ইইউ সদস্য- ১৯৯৫ সালে ও শেনজেন এলাকার সদস্য- ২০০১ সালে।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য সংস্থাটি ত্যাগ করে।
➢ সদর দপ্তর: ব্রাসেলস, বেলজিয়াম।
➢ সদস্য সংখ্যা: ২৭।
➢ সরকারি ভাষা: ২৪টি।
➢ আইন প্রণয়নকারী সংগঠন: পরিষদ ও পার্লামেন্ট।
➢ ইউরো মুদ্রার জনক: রবার্ট মুন্ডেল (কানাডা)।
➢ সর্বশেষ (২০তম) ইউরো মুদ্রা গ্রহণকারী দেশ: ক্রোয়েশিয়া (জানুয়ারি ২০২৩)।