সোভিয়েত ইউনিয়ন বা পৃথিবীর ‘রুটির ঝুড়ি’ হিসেবে খ্যাত ইউক্রেন পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত। এটি ইউরোপে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। দেশটি তার সুন্দর এবং বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং একটি ভয়ানক পারমাণবিক বিপর্যয়ের জন্য পরিচিত।
❖ ইতিহাস ও স্বাধীনতা: নবম শতক থেকে ইউক্রেনের উত্তর অংশ কিয়েভান রাশিয়ার অংশ ছিল। ১৩০০ শতকে মোঙ্গল আক্রমণে এটির পতন ঘটে। বহু শতাব্দী ধরে ইউক্রেন বিভিন্ন বিদেশি শক্তির পদানত ছিল। এদের মধ্যে আছে পোলান্ড ও রুশ সাম্রাজ্য। ১৯১৮ সালে ইউক্রেনে বলশেভিক সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের চারটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের অন্যতম প্রজাতন্ত্র ইউক্রেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে ইউক্রেনের নাম হয় ইউক্রেনিয়ান সোভিয়েত সোশালিস্ট রিপাবলিক। ১৯৯০ সালের ১৬ জুলাই ইউক্রেনের আইনসভায় সার্বভৌমত্বের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালের ২৪ আগস্ট দেশটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১ ডিসেম্বর গণভোটের মাধ্যমে ইউক্রেন পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। এই গণভোট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে বড় ভূমিকা রাখে। ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটে।
❖ সীমানা: ইউক্রেনের পশ্চিমে পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি, দক্ষিণ-পশ্চিমে রোমানিয়া ও মলদোভা, দক্ষিণে কৃষ্ণ সাগর ও আজভ সাগর। পূর্বে ও উত্তর-পূর্বে রাশিয়া এবং উত্তরে বেলারুশ। দক্ষিণ-পূর্বে ইউক্রেন ও রাশিয়াকে বিভক্ত করেছে কের্চ প্রণালী। এই প্রণালী আজভ সাগর ও কৃষ্ণ সাগরকে সংযুক্ত করেছে। ইউক্রেনের দক্ষিণাংশে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ। পশ্চিমে বিখ্যাত কার্পেথিয়ান পর্বতমালা।
❖ রাজধানী: কিয়েভ দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। যা দিনিপার নদীর তীরে অবস্থিত।
❖ ভাষা ও জনগোষ্ঠী: জনসংখ্যার চার ভাগের তিন ভাগ ইউক্রেনীয়। তাঁদের ভাষাটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর একটি শাখা। জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ রুশভাষী। ইউক্রেনীয় ভাষা ইউক্রেনের সরকারি ভাষা। দেশটির প্রায় ৫ কোটি জনগণের প্রায় ৭০ শতাংশ ইউক্রেনীয় ভাষায় কথা বলে। এছাড়া প্রায় ১ কোটি লোক রুশ ভাষায় কথা বলে। বেশির ভাগ ইউক্রেনীয় অধিবাসী রুশ ও ইউক্রেনীয় দুই ভাষাতেই কথা বলে।
❖ প্রাকৃতিক সম্পদ: প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটিতে রয়েছে কয়লা, লোহা, প্রাকৃতিক গ্যাস, ম্যাঙ্গানিজ, খনিজ লবণ, তেল, গ্রাফাইট, সালফার, কাওলিন, টাইটানিয়াম, লিথিয়াম, নিকেল, ম্যাগনেসিয়াম, কাঠ, পারদসহ বিভিন্ন উপাদান। দেশটি প্রায় ১১৭ ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। প্রায় ৮ হাজার ৭৬১টি গুরুত্বপূর্ণ খনি আছে।
❖ জলবায়ু: ইউক্রেনের বেশিরভাগ জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। ক্রিমিয়ার দক্ষিণ উপকূল ব্যতীত যেখানে একটি উপক্রান্তীয় জলবায়ু রয়েছে। জলবায়ু আটলান্টিক মহাসাগর থেকে মাঝারিভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দ্বারা প্রভাবিত হয়।
❖ অর্থনীতি: দেশটির মাটি উর্বর। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে দেশটির কৃষি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য দেশটি ‘ইউরোপের রুটির ঝুড়ি’ হিসেবে পরিচিত। দেশটির রয়েছে চার কোটি ২০ লাখ হেক্টর কৃষি জমি, যা পুরো ইউরোপের মোট কৃষিভূমির ২২ শতাংশ।
❖ শিক্ষা ও সংস্কৃতি: ইউক্রেনে রয়েছে আন্তর্জাতিকমানের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। উনিশ শতকের বিখ্যাত ইউক্রেনীয়-বংশোদ্ভুত নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক নিকোলাই গুগল রুশ ভাষায় সাহিত্যচর্চা করতেন। তিনি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। তাছাড়া, তারাশ শেভচেঙ্কোকে বলা হয় আধুনিক ইউক্রেনীয় সাহিত্যের জনক।
❖ রাজনীতি: ইউক্রেনের রাজনীতি রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার কাঠামোয় পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রপতি ও আইনসভার মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে ইউক্রেনে বহু সংকট তৈরি হয়েছে। ২০০৪ সালের দেশটিতে ‘অরেঞ্জ বিপ্লব’ সংগঠিত হয়। এই বিপ্লবের ফলে দেশটির পশ্চিমাপন্থী সরকারে বদল আসে। ২০১৪ ইউক্রেনীয় বিপ্লবের ফলে ইউক্রেনে ক্রেমলিনপন্থী সরকারের পতন হয়। রাশিয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে এবং পূর্বাঞ্চলীয় ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা চালায়। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করে রাশিয়া। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী রুশ বাহিনীকে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। প্রথমেই ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় বিশাল অংশ দখল করে নেয় রাশিয়া। মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর ইউক্রেন দেশটিতে মোতায়েন থাকা সব পারমাণবিক অস্ত্র পরিত্যাগ করে। এর বিনিময়ে তখন মস্কো ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
❖ পিপলস রিপাবলিক: দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক - এ দুটি পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে অবস্থিত। রুশভাষী অঞ্চল দুটির কিছু অংশ কিয়েভের সরকারের নিয়ন্ত্রণে, আর বাকি অংশ রুশ-সমর্থক বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। যারা এ দুটিকে দুটি আলাদা ‘পিপলস রিপাবলিক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যস্থতায় ২০১৫ সালে যে ‘মিনস্ক চুক্তি’ অনুসারে রাশিয়া ও ইউক্রেন একমত হয় যে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলদুটিকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হবে। বিনিময়ে ইউক্রেন তার সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। কিন্তু চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি।
❖ দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক রাষ্ট্র: ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চল দুটিকে একতরফাভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। স্বীকৃতির পর অঞ্চল নামকরণ করা হয় ‘দোনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিক ও লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিক’। স্বীকৃতির পর ‘স্বাধীন দেশ’ দুটির সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার চুক্তি করেন রুশ প্রেসিডেন্ট। এছাড়া লুহানস্ক ও দোনেৎস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে- কিউবা, ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া, সিরিয়া এবং জর্জিয়া প্রদেশের ওসেটিয়া ও আবখাজিয়া।
➢ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ: ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের সাতটি অবস্থিত ইউক্রেনে। এর মধ্যে রয়েছে - কিয়েভের সেন্ট-সোফিয়া ক্যাথিড্রাল, লভিভের ঐতিহাসিক কেন্দ্র, চেরনিভ্সি বিশ্ববিদ্যালয়, কার্পেথিয়ানের কাঠের গির্জা এবং সেগুলোর চারপাশে বিচ গাছের বন।
➢ টানেল অব লাভ: দ্য টানেল অব লাভ ক্লাভেনের একটি আধা-পরিত্যক্ত রেললাইন। উত্তর-পশ্চিম ইউক্রেনে অবস্থিত। রেললাইনটিকে পৃথিবীর অন্যতম রোমান্টিক জায়গা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
➢ বিশ্বের গভীরতম মেট্রো স্টেশন: বিশ্বের গভীরতম পাতাল রেল স্টেশন রয়েচে ইউক্রেনে। কিভের আর্সেলেনা মেট্রো স্টেশনটি মাটি থেকে ১০৫.৫ মিটার গভীরে।
➢ বিশ্বের বৃহত্তম সূর্যমুখী বীজের উৎস: ইউক্রেন বিশ্বের বৃহত্তম সূর্যমুখী বীজ উৎপাদনকারী দেশ। এরপরে রয়েছে রাশিয়া।
➢ লম্বা সঙ্গীত যন্ত্র: বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা সঙ্গীত যন্ত্রের ব্যবহার হয় ইউক্রেনে। এর নাম ট্রেমবিটা। মৃত্যু, বিবাহ থেকে সামাজিক উৎসব সবেতেই ট্রেমবিটা ব্যবহারের রেওয়াজ রয়েছে ইউরোপের এই দেশে।
➢ চেরনোবিল বিপর্যয়: ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয় ঘটে।
❖ একপলকে উক্রেন
নাম: ইউক্রেনীয় প্রজাতন্ত্র।
রাজধানী: কিয়েভ।
আয়তন: ৬ লাখ ৩ হাজার ৫০০ বর্গ কিলোমিটার।
জনসংখ্যা: ৪ কোটি ৩৫ লাখ।
গড় আয়ু: পুরুষ ৬৮ বছর, নারী ৭৭ বছর।
জাতিগোষ্ঠী: ইউক্রেনীয় ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রুশ ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ, অন্যান্য ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
শিক্ষার হার: ১০০ শতাংশ।
সরকার পদ্ধতি: ইউনিটারি সেমি-প্রেসিডেনশিয়াল রিপাবলিক।
প্রেসিডেন্ট: ভলোদিমির জেলেনস্কি (যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে)।
আইনসভা: ভেরখোভনা রাদা।
সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা: ২৪ আগস্ট ১৯৯১।
মুদ্রা: ইউক্রেনীয় রিভনিয়া।