সংস্কৃতি বিকাশে অমর একুশে বইমেলা ও বাংলা একাডেমি
বাংলা একাডেমি বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমি দেশের ভাষা বিষয়ক সর্ববৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এটি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং মধ্যবিত্তের জাগরণ ও আত্মপরিচয় বিকাশের প্রেরণায় প্রতিষ্ঠানটির জন্ম। অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজনসহ দেশজ সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি।
❖ বাংলা একাডেমি
বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের বিকাশ সূচিত হয়। কতিপয় বাঙালি পণ্ডিত ও বিদ্যানুরাগী বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৪০ সালে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্সে’-এ বাংলা সরকারকে একটি অনুবাদ বিভাগ স্থাপনের অনুরোধ জানান। এরপর, ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে তিনি ভাষা সংক্রান্ত একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেন। তাঁকে এজন্যই ‘বাংলা একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা’ আখ্যা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে জনমত সৃষ্টির মাধ্যমে একাডেমি প্রতিষ্ঠায় মুখ্য ভূমিকা রাখে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা।
১৯৪৮ সালের মার্চে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে তরুণরা শহিদ হন। ফলে বাংলা ভাষা সম্পর্কে গবেষণা ও চর্চার জন্য বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি বেগবান হয়।
❖ বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রদত্ত ২১ দফা ইশতেহারের ১৬ নং দফায় বাংলা ভাষার জন্য গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। নির্বাচনে বিজয়ের পর পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে যুক্তফ্রন্টের শিক্ষামন্ত্রী আজিজুল হকের প্রস্তাব অনুযায়ী বর্ধমান হাউজকে ভাষা গবেষণাগার হিসেবে রূপান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯৫৫ সালের ২৬ নভেম্বর যুক্তফ্রন্ট সরকার একাডেমি প্রতিষ্ঠায় ‘আয়োজক সমিতি’ গঠন করে।
১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার ‘বাংলা একাডেমী’ উদ্বোধন করেন। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান গণপরিষদে ‘দি বেঙ্গলী একাডেমী অ্যাক্ট’ গৃহীত হলে একাডেমি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। গবেষণা, অনুবাদ, সংকলন ও প্রকাশনা এবং সংস্কৃতি– এ চারটি বিভাগ নিয়ে একাডেমির যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ ‘দি বাংলা একাডেমী অর্ডার, ১৯৭২’ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডকে একাডেমির সঙ্গে একীভূত করা হয়। চারটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা একাডেমিতে বর্তমানে ৮টি বিভাগ ও ৩টি উপবিভাগ রয়েছে। মহাপরিচালক হলেন এর কার্যনির্বাহী প্রধান।
❖ দেশে বইমেলার ইতিহাস
দেশে প্রথম বইমেলার চিন্তাটি নিয়ে আসেন প্রয়াত কথাসাহিত্যিক জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদদীন। বাংলা একাডেমি থেকে ষাটের দশকের প্রথম দিকে তিনি গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে নিয়োগ পান। গ্রন্থকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি একটি শিশু গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) নিচতলায়। যত দূর জানা যায়, এটাই ছিল দেশের প্রথম বইমেলা। এটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ সালে। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় তিনি নারায়ণগঞ্জে আরও বড় পরিসরে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। এই মেলার আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল হাই, শহিদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম।
❖ অমর একুশে বইমেলা
১৯৭২ সালকে ইউনেস্কো ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষ্যে ওই বছর ডিসেম্বরে সরদার জয়েনউদদীন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। সেই থেকেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার সূচনা। ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানে কোনো বইমেলা হয়নি।
তবে বাংলা একাডেমির দেয়ালের বাইরে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী কিছু বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন। তাঁর দেখাদেখি স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদের (বর্তমানে মুক্তধারা প্রকাশনী) চিত্তরঞ্জন সাহা ও বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলামও বই নিয়ে বসেন।
১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমিতে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে উপলক্ষ্যে নিজামী, চিত্তবাবু ও বর্ণমিছিলসহ সাত-আটজন প্রকাশক একাডেমির ভেতরে পূর্ব দিকের দেয়ালঘেঁষে বই নিয়ে বসেন। একই সঙ্গে প্রথমবার বাংলা একাডেমির বই বিক্রয়ে স্টলের ব্যবস্থা করা হয়।
১৯৮৩ সালে তৎকালীন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কাজী মনজুরে মওলা একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন সম্পন্ন করেন। কিন্তু একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বইমেলা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৪ সালে বর্তমান অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়।
২০১৪ সালে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যানে সম্প্রসারিত হয়। ১৯৮৪ সালে গ্রন্থমেলার বিধিবদ্ধ নীতিমালা প্রণীত হয় এবং মেলার নাম হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। ২০২৩ সালে প্রথম মেলার দাপ্তরিক নাম লেখা হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’।