বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৭ হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এই সব ভাষার মধ্যে ৩ হাজার ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে (প্রায় ৪০%)। মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা। বিভিন্ন কারণে সময়ে সময়ে বহু ভাষার বিলুপ্তি ঘটেছে। আবার অনেক ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সব ভাষা নিয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো—
বেশি ব্যবহৃত ভাষা
১। ইংরেজি ভাষা: সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাষা। প্রায় ১৮৬টি দেশের আনুমানিক ১৫০ কোটি মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। এর মধ্যে ২০% মানুষের মাতৃভাষা ইংরেজি। ৮০% মানুষের এটি দ্বিতীয়, তৃতীয় বা তারও পরের ভাষা। মাতৃভাষাভাষীর সংখ্যার বিচারে এটির অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়।
২। মান্দারিন চায়নিজ ভাষা: দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষা। বিশ্বব্যাপী ১২০ কোটি মানুষ এ ভাষায় কথা বলেন। মাতৃভাষাভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় এটি বিশ্বের বৃহত্তম ভাষা।
৩। হিন্দি ভাষা: ভাষাভাষীর সংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বে তৃতীয়। বিশ্বে ৬০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এ ভাষায় কথা বলেন।
৪। স্প্যানিশ ভাষা: কথা বলার দিক থেকে এটি চর্তুথ। বিশ্বের প্রায় ৫৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই ভাষায কথা বলে।
৫। আরবি ভাষা: কথা বলার দিক থেকে এটি পঞ্চম ভাষা। এই ভাষায কথা বলেন বিশ্বের ৩৩ কোটি ৫০ লাখ মানুষ।
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভাষালিপি
বিশ্বে পরিচিত লিপি রয়েছে— ২৯৩টি।
এর মধ্যে বর্তমানে ব্যবহার হয়— ১৫৬টির বেশি।
ঐতিহাসিক লিপি বর্তমানে ব্যবহৃত হয় না— ১৩৭টির বেশি।
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম লিপি ল্যাটিন। এই লিপি ব্যবহার করেন ৭০%-এর বেশি মানুষ। বিশ্বের ৭ হাজার ১৫৯টি প্রচলিত ভাষার মধ্যে লাতিন লিপির ব্যবহার দেখা যায় ৩০৫টি ভাষায়। ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, জার্মানসহ বহু ভাষা লিখতে লাতিন লিপি ব্যবহৃত হয়। ইজিপশিয়ান হায়ারোগ্লিফস ও অ্যাজটেক পিক্টোগ্রামস বিলুপ্ত লিপি।
সবচেয়ে বিপন্ন ভাষা
বর্তমানে বিশ্বে প্রচলিত ভাষা— ৭ হাজার ১৫৯টি।
বিশ্বে বিপন্ন ভাষা— ৩ হাজার ১৯৩টি (৪৪%)।
স্থিতিশীল ভাষা— ৩ হাজার ৪৭৯টি (৪৯%)।
প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা— ৪৮৭টি (৭%)। এই ভাষাগুলো সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে প্রচলিত রয়েছে।
‘ডরম্যান্ট’ বা সুপ্ত ভাষা— ৩৩৭টি।
সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ভাষা— ৪৫৪টি।
এছাড়া বর্তমানে বিপন্ন ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন প্রায় ৮ কোটি ৮১ লাখ মানুষ। এর মধ্যে—
মাতৃভাষাভাষীর সংখ্যায় ১ হাজারের কম কথা বলে— ১ হাজার ৪৩১টি ভাষায়। ১০০-এর কম কথা বলে— ৪৬৩টি ভাষায়। মাত্র ১০ জন মানুষ কথা বলে— ১১০টি ভাষায়। বিশ্বের প্রায় ৮০% বিপন্ন ভাষার বাস মাত্র— ২৫টি দেশে।
অঞ্চলভিত্তিক বিপন্ন ভাষা
অঞ্চলভিত্তিক বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন ভাষা রয়েছে ওশেনিয়া অঞ্চলে। এরপর রয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায়। কিছু অঞ্চলভিত্তিক বিপন্ন ভাষার বিবরণ—
ওশেনিয়া— ‘ইউগামবেহ’ অস্ট্রেলিয়ার একটি বিপন্ন আদিবাসী ভাষা। এটি প্রধানত গোল্ড কোস্ট, সিনিক রিম ও লোগান অঞ্চলে ইউগামবেহ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যবহৃত হয়।
এশিয়া— ‘আইনু ইতাক’ জাপানের একটি চরমভাবে বিপন্ন ভাষা। ইউনেস্কোর মতে, এটি নিশ্চিতভাবে কোনো ভাষা-পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। ২০০৬ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, ২৩ হাজার ৭৮২ জন আইনু জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ৩০৪ জন ভাষাটি জানেন।
আফ্রিকা— ‘অঙ্গোটা’ ইথিওপিয়ায় একটি চরম বিপন্ন ভাষা। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ওয়েইতো নদীর পশ্চিম তীরে একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এ ভাষায় কথা বলত। বর্তমানে সম্প্রদায়ের সদস্য প্রায় ৪০০। যার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন প্রবীণ ভাষাটি বলতে পারেন।
আমেরিকা— উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় প্রায় সব আদিবাসী ভাষাই বিপন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে লুইজিয়ানা ক্রেওল একটি বিপন্ন ভাষা। ফরাসিভিত্তিক এ ক্রেওল ভাষায় আফ্রিকান ও আদিবাসী প্রভাব রয়েছে। এটি মূলত প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বলিভিয়ায় প্রচলিত লেকো একটি বিপন্ন ও বিচ্ছিন্ন ভাষা। লেকো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০। তবে ভাষাটি এখন শুধু প্রবীণদের মধ্যে টিকে রয়েছে।
ইউরোপ— ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রচলিত ‘কেরনেউয়েক’ একসময় ইউনেস্কোর তালিকায় বিলুপ্ত ভাষা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। পরবর্তীতে পুনরুজ্জীবনের ফলে ২০১০ সালে এর মর্যাদা ‘বিপন্ন’ করা হয়। ২০২১ সালের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আদমশুমারি অনুযায়ী, ৫৬৩ জন মানুষ এ ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করে।