বিশ্বের ক্ষুদ্রক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা এবং তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করতে জাতিসংঘ কর্তৃক ৯ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ উদযাপনের পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
❖ আদিবাসীদের বৈশ্বিক স্বীকৃতি
আদিবাসীদের অধিকার ও স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিষয় সমূহ নিয়ে ১৯৮২ সালের ৯ আগস্ট জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনটিকে স্মরণ করে জাতিসংঘ ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ৯ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে ‘জাতিসংঘ ও আদিবাসী জাতি এক নতুন অংশীদারিত্ব’ শিরোনামে ১৯৯৩ সালকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ’ ঘোষণা করে সংস্থাটি। দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হলেও বাংলাদেশে ২০০৪ সাল থেকে পালিত হচ্ছে।
❖ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক প্রণীত আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেশন, ১৯৫৭ (নং ১০৭) ও ১৯৮৯ (নং ১৬৯) অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার স্বীকৃত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ১৯৭২ সালে ২২ জুন ১০৭ কনভেশন অনুস্বাক্ষর করে এবং পরবর্তীতে কনভেশন ১০৭ এর উন্নততর ১৬৯ কনভেশনও অনুস্বাক্ষর করেন অন্য সরকার।
❖ বাংলাদেশে উপজাতি বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীর সংখ্যা ৮লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ জন। পুরুষের সংখ্যা ৮ লাখ ২৪ হাজার ৭৫১ জন। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, ৫০টি জাতিসত্তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগোষ্ঠী চাকমাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাঁদের জনসংখ্যা ৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৯৯। সংখ্যার দিক দিয়ে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অবস্থানে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামেরই দুই জাতিগোষ্ঠী মারমা ও ত্রিপুরা। মারমাদের সংখ্যা ২লাখ ২৪ হাজার ২৬২ জন। ত্রিপুরাদের সংখ্যা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৮। চতুর্থস্থানে থাকা সমতলের জাতিগোষ্ঠী সাঁওতালদের সংখ্যা ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৯ জন। তবে জেলার নিরিখে দেশে রাঙামাটিতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ জেলায় এসব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৮৬৪। দ্বিতীয় অবস্থানে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি। এখানে জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৮।
❖ বিভাগ অনুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সংখ্যা
বরিশালে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী জনসংখ্যা ৪ হাজার ১৮১জন, চট্টগ্রামে ৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৬০, ঢাকায় ৮২ হাজার ৩১১, খুলনায় ৩৮ হাজার ৯৯২, ময়মনসিংহে ৬১ হাজার ৫৫৯, রাজশাহীতে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯২, রংপুরে ৯১ হাজার ৭০ ও সিলেটে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৪ জন।
❖ বাংলাদেশের সংবিধানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা
বাংলাদেশে দিবস টিপালিত হলেও সরকারিভাবে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার নেই। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠীও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা করবেন।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০ (সংশোধিত২০১৯) ও জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী দেশে স্বীকৃত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০ টি।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান
(ক) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি বিরিশিরি, নেত্রকোণা।
(খ) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি।
(গ) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বান্দরবান।
(ঘ) কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, কক্সবাজার।
(ঙ) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ি।
(চ) রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি, রাজশাহী।
(ছ) মণিপুরী ললিতকলা একাডেমি, মৌলভীবাজার।
(জ) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, হালুয়াঘাট।
(ঝ) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, দিনাজপুর।
(ঞ) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, নওগাঁ।
❖ উল্লেখযোগ্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
বর্তমানে স্বীকৃত ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, ত্রিপুরা, গারো, ওঁরাও, তঞ্চ্যঙ্গা, ম্রো, বম, পাংখুয়া, চাক, খেয়াং, খুমি, লুসাই, কোচ, মাল পাহাড়ি, খ্যাং, ডালু, পাএ, রাজবংশী, বানাই, মাহাতো, কোল, পাহান, হদি, মুন্ডা, হাজং, খাসি, মণিপুরি ইত্যাদি।
❖ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অঞ্চলভিত্তিক অবস্থান
✔ চাকমা (৪ লক্ষ ৮৩ হাজার ২৯৯ জন): দেশের বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙ্গামাটি (প্রধান আবাসস্থল), খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এদের বসবাস। চাকমাদের নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা রয়েছ। এদের সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। এরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও প্রধান ধর্মগ্রস্থ ‘ক্রিপিটক’ এবং ধর্মীয় উৎসব বৌদ্ধ পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা, বৈশাখী পূর্ণিমা এবং প্রধান উৎসব বিজু। প্রধান পেশা কৃষি ও জুম (চাকমা শব্দ) চাষের মাধ্যমে প্রাথমিক জীবিকা নির্বাহ করে।
✔ মারমা (২ লক্ষ ২৪ হাজার ২৬২ জন): দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। এঁদের বসবাস রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান। এছাড়া কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে বসতি আছে। এদের সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও ধর্মীয় উৎসব মাঘী পূর্ণিমা, বৈশাখী পূর্ণিমা, কঠিন চীবরদান এবং প্রধান উৎসব সাংগ্রাই।
✔ সাঁওতাল (১ লাখ ২৯ হাজার ৪৯ জন): তাঁদের বসবাস দিনাজপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া, রংপুর। সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক এবং সমাজের মূল ভিত্তি হচ্ছে গ্রাম-পঞ্চায়েত। এরা প্রধানত প্রকৃতি পূজারি এবং নিজস্ব উৎসব সোহরাই ও বাহা।
✔ গারো বা মান্দি: তাঁদের বসবাস ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোণা, টাঙ্গাইল, জামালপুর, সিলেট ও গাজীপুর। তাঁদের সমাজ ব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক এবং সমাজের মূলে মাহারি বা মাতৃগোত্র পরিচয় রয়েছে। তাঁদের ভাষা ‘আচিক’ এবং নিজেদের ‘আচিকমান্দি’ পরিচয় দেয় ও উৎসব ওয়ানগালা। তাঁদের আদি ধর্মের নাম ছিল সাংসারেক এবং বর্তমানে অধিকাংশ লোক খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী।
✔ খাসিয়া বা খাসি: তাঁদের বসবাস সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট (জৈয়ন্তিকা পাহাড়ে)। এঁরা মাতৃতান্ত্রিক নৃ-গোষ্ঠী। তাঁদের গ্রামগুলো পুঞ্জি নামে পরিচিত; পুঞ্জি প্রধান ‘সিয়েম’। প্রধান পেশা পান চাষ এবং অধিকাংশ খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী।
✔ ত্রিপুরা (টিপরা): ত্রিপুরারা বসবাস করেন খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কুমিল্লা, নোয়াখালী। বর্ষবরণ উৎসব বৈসুক। সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী। পিতৃতান্ত্রিক পরিবার।
✔ রাখাইন: বসবাস পটুয়াখালী। বড় ধর্মীয় উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমা। বর্ষবরণ উৎসবের নাম সান্দ্রে।
✔ হাজং: ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোণা ও সিলেট।
✔ ওরাওঁ: দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী ও বগুড়া।
✔ লুসাই: খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান।
✔ খিয়াং: রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রাম।
✔ রাজবংশী: দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও ময়মনসিংহ।
✔ কোল: রাজশাহী ও চাপাইনবাবগঞ্জ।
✔ মণিপুরি: সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার (প্রধান আবাসস্থল) ও সিলেট।
✔ পাংখোয়া: পার্বত্য রাঙামাটি জেলার সাজেক উপত্যকা থেকে বান্দর বানের রুমা পর্যন্ত পাংখোয়া জাতির বসবাস রয়েছে।
✔ খুমি: এঁরা বান্দরবান জেলার রুমা, রৌয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলাতে বসবাস করে।
✔ ডালু: ময়মনসিংহের হালুয়া ঘাট ও শেরপুরের নালিতা বাড়ি অঞ্চলে তাঁরা বাস করে। তাঁদের আসল ভাষা মণিপুরি।
✔ কোচ: বর্তমানে শেরপুরজেলার ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী এবং শ্রীবর্দী উপজেলায় তাঁদের বসবাস।
✔ চাক: বান্দরবান ও চট্টগ্রামের চাক পাহাড়ে বসবাস করে।
✔ মুরং: বান্দর বানের গভীর অরণ্যে বসবাস। বর্ষবরণ উৎসবের নাম ছিয়াছত।
✔ রনজোগী: বান্দরবানের গভীর অরণ্যে বসবাস।
✔ তনচংগা: রাঙামাটি জেলায় বসবাস।